সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

একজন আলোকিত সহযাত্রীর চিরবিদায়: হৃদয়ে ও স্মরণে তৌফিক ইমরোজ খালিদী

✍ লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১:৩৩ পিএম
একজন আলোকিত সহযাত্রীর চিরবিদায়: হৃদয়ে ও স্মরণে তৌফিক ইমরোজ খালিদী

কিছু মানুষের চলে যাওয়া শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়; একটি সময়, একটি অধ্যায় কিংবা একটি পরিচিত কণ্ঠের নীরব হয়ে যাওয়া। সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যু আমার কাছে তেমনই একটি ঘটনা। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি রয়েছে। তাই তাঁর মৃত্যুর খবরটি অন্য অনেক খবরের মতো পড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বারবার মনে পড়ছে তাঁর সঙ্গে দেখা, কথা বলা এবং সাংবাদিকতা নিয়ে তাঁর ভাবনার নানা মুহূর্ত।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি শুধু একটি সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচালনা করেননি; বাংলাদেশের সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে দেওয়ার সময়টিরও একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। যখন অনলাইন সাংবাদিকতা আজকের মতো প্রতিষ্ঠিত ছিল না, তখন একটি সংবাদ সংস্থাকে নতুন ধারার গণমাধ্যম হিসেবে দাঁড় করানোর কাজটি সহজ ছিল না। সেই পথের অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন তিনি।

তাঁর সঙ্গে কথা বললে সাংবাদিকতা নিয়ে তাঁর আলাদা এক ধরনের দায়বোধ অনুভব করা যেত। সংবাদকে শুধু দ্রুত প্রকাশ করার বিষয় হিসেবে দেখতেন না; সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব, পেশাগত স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা নিয়েও তাঁর ভাবনা ছিল। নানা সময়ে মতের পার্থক্য থাকলেও একজন সাংবাদিকের কাজ ও সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ ছিল মূল্যবান।

আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে তৌফিক ভাইয়ের আরেকটি পরিচয় আরও গুরুত্বপূর্ণ; তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার প্রতি তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর এই অবস্থানকে আমি সবসময় শ্রদ্ধার চোখে দেখেছি। কারণ সাংবাদিকতার পেশাগত নিরপেক্ষতা মানে ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করা নয়। বরং সত্য, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে থাকা সাংবাদিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়।

তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রশংসা যেমন এসেছে, তেমনি বিতর্ক ও অভিযোগও এসেছে। দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে তদন্ত ও মামলা হয়েছিল। পরে সেই মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং আদালতের আদেশে তিনি অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি পান। তিনি একটি বারের জন্যও সাহস হারাননি। আইনগতভাবেই সবকিছু মোকাবিলা করেছেন। এমন সাহস বাংলাদেশের কতজনের আছে, আমার জানা নেই।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যু হয়েছে লন্ডনের একটি হাসপাতালে। ৫৯ বছরের জীবনে তিনি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে যে জায়গাটি তৈরি করেছিলেন, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বিশেষ করে অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশের সঙ্গে তাঁর নাম দীর্ঘদিন উচ্চারিত হবে।

ব্যক্তিগতভাবে তাঁর চলে যাওয়ায় আমার মনে হচ্ছে, পরিচিত একটি অধ্যায় হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। কিছু মানুষকে আমরা প্রতিদিন দেখি না, নিয়মিত কথা বলি না; তবু তারা আমাদের পেশাগত জীবনের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকেন। তৌফিক ইমরোজ খালিদী আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।

তাঁর সঙ্গে থাকা স্মৃতিগুলো এখন থেকে আরও বেশি করে মনে পড়বে। সাংবাদিকতার ব্যস্ততা, কথোপকথনের মুহূর্ত, তাঁর দৃঢ়তা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে তাঁর পরিচয়; সব মিলিয়ে তিনি আমার স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন।

তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও স্বজনদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা। বিদায় তৌফিক ভাই। আপনার সঙ্গে থাকা স্মৃতিগুলো থেকে যাবে।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: