শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

জাপান কেন এখনো শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখে? নেপথ্যের ভূ-রাজনীতি ও হলি আর্টিজানের উত্তরাধিকার

লিখেছেন: নীহারিকা রায়, প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬, ১:৫৩ পিএম
জাপান কেন এখনো শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখে? নেপথ্যের ভূ-রাজনীতি ও হলি আর্টিজানের উত্তরাধিকার

জাপান কেন এখনো শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখে? নেপথ্যের ভূ-রাজনীতি ও হলি আর্টিজানের উত্তরাধিকার

বাংলাদেশসহ পুরো এশিয়াই এখন তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নতুন বাস্তবতায় নেতৃত্ব, আস্থা ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—শেখ হাসিনার প্রতি জাপানের আস্থা কি এখনো অটুট? সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। সম্প্রতি জাপানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম জিজি প্রেস হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। তিনি ২০১৬ সালের হামলায় নিহত সাত জাপানি নাগরিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, তারা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জাপানি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার এবং বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত সম্পর্কের ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরেন। নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও তাঁর বিশেষ শোকবার্তা প্রচার করা হয়। এখানেই প্রশ্নের জন্ম হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে অন্য সরকার দায়িত্বে থাকলেও, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় স্মারক আয়োজনে কেন জাপান শেখ হাসিনার বক্তব্যকেই গুরুত্ব দিল? কেবল সৌজন্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আস্থা ও কৌশলগত সম্পর্ক? একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের এপ্রিলেই আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা জোট ফাইভ আইজ সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার বিষয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক করেছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে গুলশান, বনানী ও বারিধারাজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবু ১ জুলাই হলি আর্টিজানে ভয়াবহ হামলা ঘটে, যেখানে সাতজন জাপানি বিশেষজ্ঞসহ ২০ জন জিম্মি নিহত হন। অনেকের ধারণা ছিল, এই ঘটনার পর জাপান বাংলাদেশ থেকে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা গুটিয়ে নেবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। জাপান সিদ্ধান্ত নেয়, সন্ত্রাসের কাছে তারা মাথা নত করবে না। মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বড় প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত থাকে। জাপানের মূল্যায়ন ছিল—বাংলাদেশ সরকার সম্ভাব্য হামলার তথ্য পাওয়ার পর সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণ করেছিল এবং হামলার পর দ্রুত সামরিক অভিযান, জিরো টলারেন্স নীতি, জঙ্গিবিরোধী অভিযান, দ্রুত বিচার ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ দমনে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। এসব পদক্ষেপই জাপানের আস্থা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আরা পরিস্কার করে বল্লে যে বিষয়টি দাড়ায়- ট্র্যাজেডি এবং জাপানের অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত এত সব সতর্কতামূলক পদক্ষেপের পরও ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সেই নারকীয় জঙ্গি হামলাটি ঘটে যায়। নিহত হন দেশি-বিদেশি ২০ জন জিম্মি, যার মধ্যে ১৭ জনই ছিলেন বিদেশি নাগরিক (৯ জন ইতালীয়, মেট্রোরেল প্রকল্প-৬ এর ৭ জন জাপানি বিশেষজ্ঞ এবং ১ জন ভারতীয়)। এছাড়া জিম্মিদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান গোয়েন্দা পুলিশের এসি রবিউল করিম এবং বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন আহমেদ। ৫ জন জঙ্গিসহ মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯ জনে। সে সময় আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা ছিল, একসঙ্গে ৭ জন শীর্ষ বিশেষজ্ঞকে হারানোর পর জাপান হয়তো ক্ষোভে ও নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশ থেকে তাদের সব বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দেবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে জাপান উল্টো নীতি গ্রহণ করে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—সন্ত্রাসের কাছে জাপান মাথা নোয়াবে না। যে কারণে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর কাজও জাপানকে দেওয়া হয়। কেন শেখ হাসিনায় আস্থা রেখেছিল জাপান? জাপান সরকার যখন ঠান্ডা মাথায় পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করল, তখন তারা দেখতে পেল যে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা জানার পর শেখ হাসিনা সরকার প্রায় ৫-৬ স্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিল। এমনকি হামলার রাতে বনানী থানার ওসি নিজের সীমানা ছেড়ে গুলশানের বিপদে ছুটে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন। এটিই প্রমাণ করে যে, সরকার এই হুমকিকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিল। যা ঘটেছে, তা ছিল তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ট্র্যাজেডি, কিন্তু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকারের আন্তরিকতায় কোনো কমতি ছিল না। জাপানের আস্থা অর্জনের পেছনে সরকারের কিছু তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছিল অন্যতম: • অপারেশন থান্ডারবোল্ট: হামলার পর জিম্মিদের উদ্ধারে ২ জুলাই ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ম প্যারা-কমান্ডো ব্যাটালিয়নের নেতৃত্বে দ্রুত ও সফল যৌথ সামরিক অভিযান চালানো হয়। • জিরো টলারেন্স নীতি: পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) ইউনিট ও র‍্যাব দেশব্যাপী এক হাজারের বেশি চিরুনি অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেয়। • দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া: ২০১৯ সালের নভেম্বরের মধ্যেই ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৭ জন জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেন (যা পরবর্তীতে হাইকোর্টে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়)। • প্রযুক্তিগত নজরদারি: সাইবার স্পেসে উগ্রবাদ ছড়ানো রুখতে অত্যাধুনিক ইন্টারনেট ট্র্যাকিং ও সাইবার মনিটরিং প্রযুক্তি চালু করা হয়।

শেষ কথা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; দীর্ঘদিনের আস্থা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেকের কাছেই ইঙ্গিত দেয়—জাপানের কাছে শেখ হাসিনা এখনো একটি পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তবে এ ধরনের মূল্যায়নের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা সময় এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপই আরও স্পষ্ট করবে।

লেখক: নীহারিকা রায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট