শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

মিথ্যা আশ্বাস ও লুটপাটের রাজনীতি; তীব্র ভোগান্তিতে ধুঁকছে দেশের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনিক অপেশাদারিত্বে বিপর্যস্ত জনজীবন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনরোষ।

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৭ পিএম
মিথ্যা আশ্বাস ও লুটপাটের রাজনীতি; তীব্র ভোগান্তিতে ধুঁকছে দেশের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনিক অপেশাদারিত্বে বিপর্যস্ত জনজীবন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনরোষ।

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান অভূতপূর্ব অচল অবস্থা এবং তার সাথে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের চরম বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানির চরম হাহাকার, অন্যদিকে কারিগরি জ্ঞানহীন রাজনৈতিক চমকপ্রদ দাবি—উভয় মিলে রাষ্ট্র পরিচালনায় এক গভীর অপেশাদারিত্ব ও নীতিগত বিশৃঙ্খলা ফুটিয়ে তুলছে।

সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দাবি করেছেন যে, পদ্মাব্যারেজের মতো অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর মেগা প্রকল্পের প্রকৌশলগত ও প্রযুক্তিগত নকশা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে তৈরি করছেন। এই মন্তব্য জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোড়ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতের মেধাভিত্তিক সমাজ এই দাবিকে সরাসরি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাবর্জিত ও চরম হাস্যাস্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মার মতো খরস্রোতা নদীর হাইড্রোলিক প্রেসার, জটিল রিভার মরফোলজি, তলদেশের মাটির বিয়ারিং ক্যাপাসিটি এবং নানামুখী স্ট্রাকচারাল লোড ক্যালকুলেশনের মতো অতীব জটিল গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো এড়িয়ে কোনো অ-প্রকৌশলী ব্যক্তির পক্ষে এমন মেগা প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন সম্পূর্ণ অসম্ভব। রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ পদে আসীন ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক দাবি কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই নয়, প্রশাসনিক চরম অপেশাদারিত্বের এক আশঙ্কাজনক নজির।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নীতিগত বিভ্রান্তির পাশাপাশি বাস্তবে সাধারণ মানুষ এক অভূতপূর্ব বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে নিপতিত। রাজপথ থেকে শিল্পাঞ্চল—সর্বত্রই এখন হাহাকার। নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে দেশের প্রধান শিল্প খাতগুলো ধুঁকছে। ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে বহু শিল্পকারখানা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রায় আট লাখ শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকারত্বের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।

বিএনপি ও সমমনা নেতাদের অতীত ও বর্তমানের দ্বিমুখী ভূমিকা এবং জনভোগান্তি নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এক প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বলেন—

"একসময় সামান্য ঘাটতিতেই বিরোধী দলগুলো সোচ্চার হয়ে রাজপথে স্লোগান দিত—'গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে'। অথচ আজ দেশের মানুষ যখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভূতপূর্ব সংকটে দিনরাত চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারাচ্ছে, তখন তাদের প্রশাসনিক নীরবতা ও চটকদার বক্তব্য চরম দায়িত্বহীনতার শামিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে আজ দেশটাকে চরম অব্যবস্থাপনায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।"

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প (যেমন—পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল বা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র) নিয়ে অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল, তা আজ তাদের নিজেদের ওপরই নীতিগত বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। তৎকালীন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলকে অহেতুক প্রশ্নবিদ্ধ করার পর, বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনা ও অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে নিজেদের চরম ব্যর্থতা ঢাকতে অবৈজ্ঞানিক চটকদার দাবির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। একদিকে কার্যকর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনে ব্যর্থতা, অন্যদিকে পদ্মাব্যারেজের মতো অবৈজ্ঞানিক কথা বলে জনদৃষ্টি অন্যদিকে মোড় ঘোরানোর এই রাজনৈতিক অপকৌশল সাধারণ মানুষকে কেবল হতাশই করছে না, বরং সমগ্র প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দিচ্ছে।

গবেষণা ও সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষণ প্রতিবেদন:

বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামত ও প্রতিক্রিয়া চরমভাবে বিস্ফোরক এবং ত্রিমুখী ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। 'বাংলাদেশ ক্রাইসিস' বা দেশীয় সংকট কেন্দ্রিক প্রকাশিত সাম্প্রতিক পোস্টগুলোর প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে ডিজিটাল ব্যবহারকারীদের তিনটি প্রধান মানসিকতা ও জনমত চিহ্নিত করা হয়েছে:

১. উগ্র ক্ষোভ ও কঠোর কর্মসূচির দাবি (অস্থিরতা ও রাজপথ কেন্দ্রিক) সামাজিক মাধ্যমের একটি বড় অংশ তীব্র রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি তাত্ক্ষণিক রাজপথের কঠোর কর্মসূচির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করছে। দেশের সার্বিক অচলাবস্থা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা সরকারবিরোধী বা সরাসরি ঢাকা অচল করার মতো কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে মত দিচ্ছে।

• উদাহরণ: 'আদিবাসী মেয়ে' নামক আইডি থেকে পোস্ট করা হয়: "দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে---- 'ঢাকা লকডাউন' সফল করুন! সফল করুন ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬"। এতে 'Nafiza Islam' এবং 'Md Gias Uddin'-এর মতো ব্যবহারকারীরা "Right" এবং "একদম ঠিক" বলে সমর্থন প্রকাশ করেছেন।

২. প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি চরম হতাশা ও নৈরাজ্যবাদ ব্যবহারকারীদের দ্বিতীয় একটি বড় অংশ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সমর্থন না করে দেশের সমগ্র রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থা ও বিরাগ প্রকাশ করছে। তারা ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষকেই সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগের জন্য সমভাবে দায়ী মনে করছে। তাদের মতে সব রাজনৈতিক দলই স্বার্থান্বেষী।

• উদাহরণ: 'Fucking BD Politics' প্রোফাইল থেকে মন্তব্য করা হয়: "সব নুহটিরপুলারাই ধোঁয়া তুলসি পাতা", এবং 'ML Manik' প্রশ্ন তোলেন: "আপনারা কী কী করছেন তার তালিকা কী দেখেন নাই"-এর মতো নিরপেক্ষ ও তীব্র বীতশ্রদ্ধ মন্তব্য।

৩. পূর্বতন শাসনব্যবস্থার পুনর্বাসন ও রাজনৈতিক সংহতি তৃতীয় ধারার মন্তব্যগুলোতে বর্তমান সংকট কাটাতে পূর্ববর্তী সরকার বা আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সুরক্ষাকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তারা জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য শেখ হাসিনার হাতকেই নিরাপদ ভাবছেন।

• উদাহরণ: 'Miraj Hossain' লিখেছেন: "দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সহ আপামর জনসাধারণ এবং জনগণের জানমাল ও জীবন-জীবিকা একমাত্র শেখ হাসিনার হাতেই নিরাপদ..."। এছাড়া 'Jouno Telivision' এবং 'Mahim Khan' "জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু" স্লোগানসহ ক্ষমতার পরিবর্তনের আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।

সামাজিক নেটওয়ার্কের এই প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, সাধারণ জনগণের মধ্যে নীতি-নির্ধারকদের প্রতি আস্থা এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। একদল কট্টর রাজপথের আন্দোলনের দিকে ঝুঁকছে, অন্যদল রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, আর তৃতীয় একটি পক্ষ পুরোনো শাসনব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনের আশা করছে।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।