শূন্য কোল আর স্বজনহারা আর্তনাদ: ডেঙ্গুর মরণ কামড়ে স্তব্ধ চারপাশ। মৃতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়াল: হাসপাতালের বিছানায় থামছে না স্বজনহারাদের বুকফাটা কান্না।
আকাশের মেঘ হয়তো প্রকৃতিকে স্নিগ্ধ করে, কিন্তু সেই বৃষ্টির রেশ কাটতেই ঘরের কোণে নেমে আসে অন্ধকার। প্রতিটি হাসপাতালে এখন দীর্ঘশ্বাস আর স্বজনহারাদের কান্নার রোল। ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা কেড়ে নিচ্ছে আমাদের চেনা মুখগুলো, গুঁড়িয়ে দিচ্ছে হাসিখুশি পরিবারগুলোর সাজানো স্বপ্ন। পরিসংখ্যানের শুকনো খতিয়ান বলছে, চলতি বছরের ২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮২ হাজার ৭৬১ জন মানুষ। অথচ গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যাটা ছিল ৪৮ হাজার ২২৮ জন। এক বছরের ব্যবধানে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৭২ শতাংশ! কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারও মায়ের বুকফাটা কান্না, বাবার শূন্য কোল আর পরিজন হারানোর গভীর হাহাকার। মৃত্যুর মিছিল আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প জীবন বাঁচানোর আকুতি নিয়ে যারা হাসপাতালে ছুটে গেছেন, তাদের অনেকেই আর ঘরে ফেরেননি। গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে গেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। • গত বছরের ২ অক্টোবর পর্যন্ত যেখানে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২০২ জন, চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫০ জনে। • অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আমরা চিরতরে হারিয়েছি আরও ৪৮টি তাজা প্রাণ। • শুক্রবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শেষ ২৪ ঘণ্টায়ও প্রাণ গেছে টাঙ্গাইলের আরও একজনের। আর নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে লড়ছেন ১ হাজার ১৬৩ জন মানুষ। কোন অঞ্চলে কেমন হাহাকার? ডেঙ্গুর এই তাণ্ডব যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগে। এ বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। • একাই ৩৩ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১১৬ জন। • এছাড়া খুলনা বিভাগে ৪৭ জনের মৃত্যু এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। • যদিও সিলেট বিভাগে তুলনামূলকভাবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম (মাত্র ১ জন) এবং সিলেট ও রাজশাহী বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো রোগী ভর্তি হননি, তবুও পুরো দেশজুড়ে আতঙ্ক কাটছে না। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৬৫০ জন মানুষ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। তাদের প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে আছে বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি। কেন এই নির্মম পরিণতি? কীটতত্ত্ববিদদের মতে, লাগাতার বৃষ্টিপাত এবং পরিবর্তিত আবহাওয়ার কারণে মশার বংশ বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সামান্য অবহেলা আর অসচেতনতা আজ আমাদের ঘরের দরজায় ডেকে আনছে মরণদূত। আমাদের ছোট্ট সচেতনতাই পারে একটি প্রাণ বাঁচাতে: • ঘরে বা আশপাশে কোথাও যেন জমে থাকা পানি তিন দিনের বেশি না থাকে। • দিনে কিংবা রাতে—সব সময়ই মশারি ব্যবহার করুন। • জ্বর সামান্য মনে হলেও অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। একটি জীবন নিভে যাওয়ার অর্থ একটি পুরো পরিবারের আলো চিরতরে নিভে যাওয়া। আসুন, এই ভয়াল ডেঙ্গু পরিস্থিতির বিরুদ্ধে নিজেরা সচেতন হই, অন্যকে সচেতন করি। একটি প্রাণও যেন আর অকালে ঝরে না যায়।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
শহর পেরিয়ে এখন গ্রামে গ্রামে কান্নার রোল: ডেঙ্গুর নীরব থাবায় নিভছে নিষ্পাপ শিশুদের জীবনপ্রদীপ
স্বজনদের ভারী নিঃশ্বাস আর অবুঝ শিশুর করুণ বিদায়: ডেঙ্গুতে ৩০০ ছুঁইছুঁই মৃত্যু, হামের থাবায় ঝরলো আরও ৮ তাজা প্রাণ
শিশুদের কান্না আর স্বজন হারানোর মিছিলে ভারী হচ্ছে বাতাস: মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে আমাদের চেনা ঢাকা শহর