সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

সংবাদ পর্যালোচনা

সীমান্ত অরক্ষিত রেখে গৃহযুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ জোয়ারে গা ভাসানো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত: সেনা সদরের কড়া বার্তা ও পরিবর্তিত মাঠের সমীকরণ। অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা বনাম আঞ্চলিক বারুদ ।

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২ অক্টোবর ২০২৬, ১:৫৮ পিএম
সীমান্ত অরক্ষিত রেখে গৃহযুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ জোয়ারে গা ভাসানো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত: সেনা সদরের কড়া বার্তা ও পরিবর্তিত মাঠের সমীকরণ। অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা বনাম আঞ্চলিক বারুদ ।

পহেলা অক্টোবর সেনা সদরে অনুষ্ঠিত সেনাপ্রধানের জরুরি দরবার ও অফিসার্স অ্যাড্রেস দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক কূটনীতিতে এক মারাত্মক অস্বস্তিকর সত্যকে সামনে এনেছে। ২৪-এর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের দীর্ঘ আড়াই বছর পার হয়ে গেলেও দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরমভাবে বেহাল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের নখদন্তহীন নীতি এবং মাঠ প্রশাসনের নজিরবিহীন স্থবিরতা আজ রাষ্ট্রকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।

একদিকে সরকারের শীর্ষ মহলের চরম বিব্রতকর অবস্থান এবং অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তে ভয়াবহ যুদ্ধের পদধ্বনি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ এক দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে, রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর নৃশংস বিমান হামলা এবং আরাকান আর্মির তৎপরতার জেরে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত পুরোপুরি বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। এমন এক যুদ্ধাবস্থায় সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা করার নামে সেনাবাহিনীকে মাঠের রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে টেনে নামানোর যে কোনো পাঁয়তারা দেশের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।

প্রতিবেদনের মূল বিষয়সমূহ: এক নজরে বিশ্লেষণ

সেনা সদরের কড়া অবস্থান:

অতীত অভিজ্ঞতার তিক্ততা (যেমন—অপারেশন ক্লিন হার্ট) এবং আইনি মারপ্যাঁচের আশঙ্কায় সশস্ত্র বাহিনীকে সরাসরি রাজনৈতিক বা যৌথ অভিযানে নামানোর তীব্র বিরোধিতা করেছেন সেনা কর্মকর্তারা।

সীমান্তের রেডলাইন ও চরম ঝুঁকি:

মিয়ানমার সীমান্তে চলমান যুদ্ধ এবং রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলার কারণে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এক ইঞ্চিও শিথিল করার সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক ব্যবহারের অপচেষ্টা: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়ে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে সেনাবাহিনীকে ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের গোপন তৎপরতা চলছে।

সীমান্তবর্তী নতুন উদ্বেগ: বান্দরবানের থানচি সীমান্ত ও বড়মদক এলাকায় আরাকান আর্মির প্রশিক্ষণ ক্যাম্প এবং রোহিঙ্গা সংকট পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও রক্তক্ষয়ী করে তুলেছে।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

কেন মাঠের রাজনীতিতে নামতে নারাজ সেনাবাহিনী?

১. অপারেশন ক্লিন হার্টের ছায়া ও আইনি জটিলতা ২০০২ সালের আদলে 'অপারেশন ক্লিন হার্ট'-এর মতো কোনো বিতর্কিত ও যত্রতত্র অভিযানের পথে হাঁটতে নারাজ সামরিক বাহিনী। অতীতে এই ধরনের অভিযানের কারণে পরবর্তী সময়ে সামরিক কর্মকর্তাদের নানা ধরনের আইনি হয়রানি ও বিচারিক গ্যাঁড়াকলে পড়তে হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদও স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান সরকারের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে সরকারের ভেতরের একটি প্রভাবশালী মহল বিশেষ কোনো দলের রাজনৈতিক তৎপরতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দেশে ফেরা ঠেকাতে সশস্ত্র বাহিনীকে মাঠে নামানোর প্রবল চাপ তৈরি করে চলেছিল।

২. সীমান্ত সুরক্ষা বনাম অভ্যন্তরীণ মব সন্ত্রাস

গত ২৮ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াকতাও শহরে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় প্রায় ৫০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা এবং সীমান্তজুড়ে যুদ্ধপরিস্থিতি দেশের সার্বভৌমত্বকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। বান্দরবানের থানচি ও বড়মদক সীমান্ত পিলার সংলগ্ন এলাকায় আরাকান আর্মির ক্যাম্প এবং রুটিনবহির্ভূত তৎপরতা বাংলাদেশের ভেতর পর্যন্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমন একটি স্পর্শকাতর সময়ে সীমান্ত থেকে সেনা উপস্থিতি কমিয়ে সিভিল প্রশাসন বা ‘মব সন্ত্রাস’ দমনে নিয়োজিত করা হলে তা হবে আত্মঘাতী। সেনা কর্মকর্তাদের মতে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

৩. বারবার ক্ষমতা দিয়েও ফলশূন্যতা

৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় নয় দফায় সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবে তার স্থায়ী কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গত ২২ জুন ৫ দিনের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হলেও মাঠের বাস্তবতায় কোনো কার্যকর পরিবর্তন আসেনি। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রের সুরক্ষায় সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বাহিনীকে মানতে হবে বটে, তবে দেশের প্রতিরক্ষা লাইন অরক্ষিত রেখে বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘানি টানতে বাধ্য করা উচিত নয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে ব্যর্থ হয়ে দেশের প্রতিরক্ষা প্রাচীর দুর্বল করা কোনো দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সীমান্ত যখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, তখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব মেটাতে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর যে কোনো সিদ্ধান্ত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে।

এই মুহূর্তে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত সুরক্ষা নাকি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা সামলানো—কোনটিকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: