মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

দ্বিতীয় পর্ব: প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা পদ্ধতি

লিখেছেন: অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বিএসএমএমইউ। প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩:০২ পিএম
দ্বিতীয় পর্ব: প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা পদ্ধতি

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ার কারণে এর মূল চিকিৎসা হলো 'সাপোর্টিভ কেয়ার' বা উপসর্গভিত্তিক সেবা। কোনো জাদুকরী ওষুধ দিয়ে এই ভাইরাস এক নিমেষে দূর করা সম্ভব নয়, তবে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে জটিলতা সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব।

ডেঙ্গু শনাক্তকরণে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা

জ্বর আসার পরপরই আতঙ্কিত হয়ে অনর্থক একগুচ্ছ অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করানোর কোনো প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনক্ষণ মেনে পরীক্ষা করা উচিত: ১. NS1 Antigen Test: জ্বর শুরুর প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের মধ্যে এই পরীক্ষাটি করা হলে সবচেয়ে নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়। ২. Anti-Dengue Antibody (IgM & IgG): জ্বর শুরু হওয়ার ৪ থেকে ৬ দিন অতিবাহিত হলে রক্তের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করতে হয়। ৩. CBC (Complete Blood Count): রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ এবং প্যাকড সেল ভলিউম বা হেমোটোক্রিট (Hematocrit) পরিমাপের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্লাটিলেট সাধারণত জ্বর শুরুর ৪-৫ দিন পর থেকে কমতে শুরু করে। তাই ৩-৪ দিনের আগে প্লাটিলেট টেস্ট করলে প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। অনেক রোগী ও স্বজন দিনে ২-৩ বার করে বিভিন্ন ল্যাব থেকে প্লাটিলেট পরীক্ষা করান, যা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এবং রোগীর জন্য মানসিক চাপের কারণ। হেমোটোক্রিট বা রক্তের ঘনত্বের দিকে নজর রাখা প্লাটিলেটের চেয়েও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি জরুরি।

প্রাথমিক ও দৈনন্দিন চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ঘরে বসেই বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হতে পারেন, যদি কয়েকটি মৌলিক নিয়ম মেনে চলা হয়:

ব্যথানাশক সেবনে চরম সতর্কতা:

ডেঙ্গু জ্বরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য একমাত্র প্যারাসিটামল (Paracetamol) জাতীয় ওষুধই নিরাপদ। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ গ্রাম পর্যন্ত প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। কোনো অবস্থাতেই এনএসএআইডি (NSAID) জাতীয় ওষুধ—যেমন অ্যাসপিরিন, ডাইক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন, ন্যাপপ্রোক্সেন বা মেফেনামিক এসিড সেবন করা যাবে না। এই ওষুধগুলো রক্তের প্লাটিলেট কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং পাকস্থলী ও রক্তনালীতে মারাত্মক রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ:

ডেঙ্গু চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তরল ব্যবস্থাপনা। রক্তনালী থেকে পানি বের হয়ে যাওয়ার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। তাই প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার তরল খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে সাধারণ পানির পাশাপাশি খাবার স্যালাইন (ORS), ডাবের পানি, ডালের পানি, সুপ, লেবুর শরবত ও দুধ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। রোগী মুখে খেতে না পারলে বা বমি হলে অবিলম্বে শিরাপথে (Intravenous) স্যালাইন প্রয়োগ করতে হয়।

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধ:

যেহেতু ডেঙ্গু কোনো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নয়, তাই এতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। চিকিৎসকের লিখিত নির্দেশ ছাড়া নিজ উদ্যোগে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা শরীর ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

কখন ও কাদের জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে?

সব ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয় না, তবে কিছু "ওয়ার্নিং সাইন" বা সতর্কসংকেত দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণসমূহ:

রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া (বিশেষত ৫০,০০০ এর নিচে)। শরীরের কোনো অংশ (নাক, মাড়ি, ত্বক, বমি বা পায়খানার সঙ্গে) রক্তপাত শুরু হওয়া। একটানা বমি হতে থাকা বা মুখে কোনো খাবার না রাখা। তীব্র ও অসহ্য পেটে ব্যথা হওয়া। প্রস্রাবের পরিমাণ মারাত্মক কমে যাওয়া (৬ ঘণ্টার বেশি প্রস্রাব না হওয়া)। অতিরিক্ত অবসাদ, মাথা ঘোরা, রক্তচাপ কমে যাওয়া বা হাত-পা ঠান্ডা ও নীল হয়ে আসা। চোখ হলুদ হওয়া অর্থাৎ জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেওয়া।

উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ যাদের শুরুতেই হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন:

বিশেষ কিছু শ্রেণীর মানুষের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে শুরু থেকেই অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন। ১. ছোট শিশু ও প্রবীণ ব্যক্তি: এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও তরল ধারণক্ষমতা সংবেদনশীল। ২. গর্ভবতী নারী: গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে মা ও অনাগত সন্তান উভয়ের জীবন বিপন্ন হতে পারে। ৩. দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি: যারা আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, লিভারের সমস্যা, হার্টের অসুখ, ক্যানসার বা স্ট্রোকে ভুগছেন। ৪. পুনরায় আক্রান্ত রোগী: যারা ইতিপূর্বে অন্তত একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

রোগীর সঠিক পরিচর্যা ও মশারির ব্যবহার

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে সবসময় একটি আলাদা কক্ষে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং সার্বক্ষণিক মশারির ভেতরে রাখা বাধ্যতামূলক। এর মূল কারণ হলো, আক্রান্ত রোগীকে যদি কোনো সাধারণ এডিস মশা কামড়ায়, তবে সেই মশাটি অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ে ডেঙ্গু ছড়িয়ে দেবে। এটি পরিবার ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখার একটি মৌলিক দায়িত্ব।

লেখক: অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বিএসএমএমইউ।