মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

কার সাথে যুদ্ধ করবে বাংলাদেশ? চীনের ফাইটার জেট, প্রতিরক্ষা কৌশল ও ভারতের উদ্বেগ, 'অপারেশন সিঁদুর'-এ এই ফাইটার কার্যকর দক্ষতা দেখিয়েছিল- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিতে -

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ৩:৪৭ পিএম
কার সাথে যুদ্ধ করবে বাংলাদেশ? চীনের ফাইটার জেট, প্রতিরক্ষা কৌশল ও ভারতের উদ্বেগ, 'অপারেশন সিঁদুর'-এ এই ফাইটার কার্যকর দক্ষতা দেখিয়েছিল- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিতে -

চীন থেকে ৪.৫ জেনারেশনের অত্যন্ত আধুনিক ‘J-10CE’ ফাইটার জেট কেনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, 'অপারেশন সিঁদুর'-এর সময় ভারতীয় রাফালের বিরুদ্ধে এই ফাইটার জেটটি কার্যকর দক্ষতা দেখিয়েছিল। মিয়ানমারের বিমানবাহিনীর তুলনায় এই প্রযুক্তি অনেক বেশি উন্নত হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কার বিরুদ্ধে এই প্রস্তুতি নিচ্ছে?

ভারতের জন্য এই চুক্তি অত্যন্ত চিন্তার কারণ। ভারতের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত রয়েছে। চীনের প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের সামরিক ব্যবহারের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ ভারত, চীন ও পাকিস্তানের একটি সমন্বিত বলয় তৈরির ইঙ্গিত দেয়। ভারতের সাবেক চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহানও এমন ত্রিদেশীয় অক্ষের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। এই পরিস্থিতি ভারতের 'প্রতিবেশী প্রথম' পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক কৌশল পুনর্বিবেচনার তাগিদ দেয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে অর্থ ছাড়ের সুপারিশ পাঠানো হয়েছে এবং সবুজ সংকেত পেলেই বেইজিংয়ের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাবে ঢাকা। দৃশ্যত একটি সাধারণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের মতো মনে হলেও, এই পদক্ষেপ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও ভারতের প্রতিবেশী নীতির ওপর এক গভীর প্রভাব ফেলতে চলেছে।

J-10CE ফাইটার জেট ও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ভাবনা

J-10CE সাধারণ কোনো সামরিক বিমান নয়; এটি ৪.৫ জেনারেশনের অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন মাল্টিরোল ফাইটার জেট। তুলনামূলক বিচারে, ভারতীয় বিমানবাহিনীর হাতে থাকা ফরাসি 'রাফাল' যুদ্ধবিমানও এই একই জেনারেশনের অন্তর্ভুক্ত। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত উত্তেজনা থাকলেও, মিয়ানমার বিমানবাহিনীর সার্বিক সক্ষমতার বিচারে বাংলাদেশের জন্য এত উচ্চ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমানের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্ন তোলে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র তার নিজস্ব ‘থ্রেট ক্যালকুলেশন’ বা নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনা করেই প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশ যে প্রস্তাবটি প্রস্তুত করেছে, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে—পাকিস্তান কর্তৃক পরিচালিত চীনের তৈরি এই J-10CE ফাইটার জেটগুলো পূর্বে 'অপারেশন সিঁদুর'-এর মতো সীমান্ত উত্তেজনায় ভারতীয় রাফালের বিরুদ্ধে কার্যকর দক্ষতা দেখিয়েছিল। একটি প্রতিবেশী দেশ যখন সরাসরি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সফল সামরিক প্রযুক্তিকে নিজেদের বহরে যুক্ত করতে চায়, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্ববর্তী দেশের জন্য কৌশলগত বার্তার রূপ নেয়।

ভারতের ‘একই সঙ্গে তিন ফ্রন্ট’ ও চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফের পূর্বাভাস

ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গেই। কৌশলগতভাবে বাংলাদেশকে ভারতের তিন দিক থেকে ঘিরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ঢাকায় চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়া নয়াদিল্লির জন্য সরাসরি লাল সতর্কসংকেত। কিছুদিন আগেই ভারতের সাবেক ‘চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ’ (CDS) জেনারেল অনিল চৌহান একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন—ভবিষ্যতে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যেখানে চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ একসাথে ভারতের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অক্ষ তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সেই পূর্বাভাসের সঙ্গেই মিলে যাচ্ছে। চীন প্রস্তুতকারক হিসেবে, পাকিস্তান ব্যবহারকারী ও প্রত্যক্ষ উদাহরণ হিসেবে এবং বাংলাদেশ নতুন ক্রেতা হিসেবে একই প্রতিরক্ষা বলয়ে যুক্ত হওয়াটা নয়াদিল্লির দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ।

কোথায় গলদ? ভারতের একপাক্ষিক নীতির পুনর্বিবেচনার সময়

এই সার্বিক প্রেক্ষাপট ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি এবং ‘প্রতিবেশী প্রথম’ (Neighbourhood First) কৌশলের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে। চীন যেভাবে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে ভারতের একেবারে দোড়গোড়ায় প্রভাব বিস্তার করছে, তাতে স্পষ্ট যে ভারতের কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না।

ভারতের জন্য এখন আর নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকার সময় নেই। বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের এই সম্ভাব্য ত্রিদেশীয় কৌশলগত অক্ষ সম্পূর্ণভাবে সমন্বিত হওয়ার আগেই ভারতের উচিত তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতাগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করা। কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত বা ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ওপর নির্ভর না করে, অর্থনৈতিক চুক্তি, সামরিক অংশীদারিত্ব এবং বিশ্বাসযোগ্য কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবেশীদের আস্থায় ফেরানো এখন ভারতের জন্য সময়ের দাবি। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই নয়াদিল্লিকে তার কৌশলগত পদক্ষেপ সুনির্দিষ্ট করতে হবে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)