রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

রক্তাক্ত আগস্ট ও আমার বিবেকের রক্তক্ষরণ: হৃদয়ে আঁকা পিতা ও স্বদেশের অমর আলেখ্য

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম
রক্তাক্ত আগস্ট ও আমার বিবেকের রক্তক্ষরণ: হৃদয়ে আঁকা পিতা ও স্বদেশের অমর আলেখ্য

"এই পলিমাটির রূপ, সমৃদ্ধি আর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বারবার চোখ পড়েছে আগ্রাসী শক্তির। শৃঙ্খলিত হয়েছে জনপদ, লুণ্ঠিত হয়েছে সম্পদ। কিন্তু ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসন কিংবা পাকিস্তানিদের দীর্ঘ শোষণ—কোনো অত্যাচারই এ মাটির সন্তানকে নোয়াতে পারেনি। স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছেন অগণিত বীর।" অবশেষে, পাকিস্তানি জান্তাদের নির্মম শোষণে যখন পূর্ব বাংলা আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই রক্তিম সূর্যের মতো উদয় হলেন এক মহামানব—আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধু এক নেতা নন, ছিলেন শোষিত বাঙালির পরম এক আশ্রয়, মুক্তির দিশারী। তাঁর এক তর্জনীর আহ্বানে জেগে উঠেছিল ঘুমন্ত বাঙালি জাতি। ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৫৪-র নির্বাচন, ৬৬-র ঐতিহাসিক ৬ দফা, ৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান আর ৭০-র বিপুল গণরায়—সব পথ পেরিয়ে ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম; সবই পরিচালিত হয়েছিল তাঁর অপরাজেয় নির্দেশনায়। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের অসীম সম্ভ্রমের বিনিময়ে লাল-সবুজ পতাকায় লেখা হলো এক নতুন ইতিহাস: ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’।

কিন্তু হায় ভাগ্য! যে মাটির জন্য, যে মানুষের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত ভোরে কালেনিয়তির নির্মমতায় সেই মাটির কিছু কুলাঙ্গার ও বিশ্বাসঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেল বঙ্গবন্ধুর বুক। সপরিবারে বিদায় নিতে হলো ১৮টি তাজা প্রাণকে। বিশ্ব ইতিহাসে এমন কলঙ্কজনক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড আর দ্বিতীয়টি নেই। বুলেটের আঘাত শুধু বঙ্গবন্ধুর দেহে লাগেনি, আঘাত হানা হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতার মূলচেতনায়। একজন প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেই দিনটি আমার বুকের ভেতর যে কী তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা বলে বোঝানো অসম্ভব। এক দুঃসহ মানসিক যন্ত্রণা আর অবর্ণনীয় ক্ষোভ নিয়ে আমি দ্বিতীয় এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম, পুরো দেশ অমনি গর্জে উঠবে, রক্তে ভেসে যাবে অন্যায়ের দুর্গ!

কিন্তু আমাদের নিয়তি কত নির্মম! রাজপথ উত্তাল হওয়ার বদলে দেখলাম সুবিধাবাদী ও কাপুরুষদের ভিড়। জাতীয় চার নেতা—তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান এবং তোফায়েল আহমদ ও আবদুর রাজ্জাকের মতো কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুসারী ছাড়া অনেকেই মোশতাকের রক্তভেজা মন্ত্রীসভায় যোগ দিল। আসলে, স্বাধীনতার পর থেকেই যে স্বাধীনতাবিরোধী শকুনরা ওৎ পেতে ছিল, পঁচাত্তরের এই হত্যাযজ্ঞ ছিল তারই চরম বহিপ্রকাশ।

১৫ আগস্টের পরপরই ঘাতকদের বিষাক্ত থাবা নেমে এলো মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলল অমানবিক নিপীড়ন। দেখতে দেখতে রাতারাতি বদলে গেল প্রশাসনের চেনা মুখগুলো। রাজাকারদের উল্লাস আর অহংকার আবার বাতাস ভারী করে তুলল। এখনো চোখ বুজলে স্পষ্ট দেখতে পাই—হোমনা থানার আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম রুক্কু মিয়ার মতো নিরপরাধ মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করার দৃশ্য! মুক্তিযোদ্ধাদের অপরাধ ছিল কেবলই দেশের জন্য যুদ্ধ করা; তাই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হতো তাদের। রাতারাতি ছড়ানো হলো ভারতবিদ্বেষের বিষবাষ্প, তল্লাশির নামে লুণ্ঠিত হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি।

সেই কালো ভোরের স্মৃতি আজও আমার বিবেককে তিলে তিলে দংশন করে। যৌবনের সেই দুঃসহ আঘাত আমার চেতনাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। কিন্তু আমি দমে যাইনি; সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে ছাত্র রাজনীতি ও এ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছি।, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ থেকে আমাকে একচুলও নড়ানো যায়নি।

ঘাতকদের আইনি সুরক্ষা দিতে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি মোশতাক জারি করেছিল কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’। পরবর্তীতে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান প্রহসনের ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে পঁচাত্তর থেকে ৭৯ পর্যন্ত করা সব জঘন্য অধ্যাদেশকে আইনি বৈধতা দেন। মোশতাক-জিয়া-খালেদা চক্র কেবল খুনিদের রক্ষাই করেনি, তাদের পুরস্কৃত করেছে বিদেশের দূতাবাসে পদ দিয়ে, ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে, এমনকি দেশদ্রোহী গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব আর শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে।

দীর্ঘ ২১ বছরের অশ্রু, অপেক্ষা আর সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে। খুলে যায় বহুল প্রতীক্ষিত বিচারের দ্বার। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, ২০০১-এ ঘাতক জোটের অহেতুক দীর্ঘসূত্রতা এবং ২০০৭-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইনি পদক্ষেপ পেরিয়ে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কার্যকর হয় পাঁচ কলঙ্কিত খুনি সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি। যে ঘাতকরা এখনো পালিয়ে আছে, তাদের ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করা আজ সময়ের দাবি।

মনে রাখতে হবে, ১৫ আগস্ট আর ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা ছিল একই সুতোয় গাঁথা—বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বহীন ও আদর্শহীন করার এক নীল নকশা। বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও ২১ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে; যার সবচেয়ে বিভীষিকাময় রূপ ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। কিন্তু বিধাতার অশেষ কৃপায় ও জনগণের প্রার্থনায় তিনি বারবার বেঁচে গিয়ে দেশ ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

বায়ান্ন থেকে একাত্তর—বাঙালির প্রতিটি স্বপ্ন আর রক্তক্ষরণের সাথে জড়িয়ে আছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নাম। বিশ্বের ইতিহাসে তিনি একমাত্র নেতা, যিনি স্বাধীনতার আগেই স্বজাতির কাছে 'জাতির পিতা'র আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

জাতির পিতার রক্তঋণ শোধ করার একটাই পথ—তাঁর অদম্য দেশপ্রেম, সততা ও আদর্শকে নিজেদের মনে-প্রাণে ধারণ করা। আসুন, শোককে শক্তিতে পরিণত করে, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে একটি স্বাবলম্বী, উন্নত ও সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিই। তবেই শান্তিতে ঘুমাবে আমাদের পিতা, সার্থক হবে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ।

১৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত রাতে শাহাদাতবরণকারী জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের প্রতিটি অমলিন আত্মার পরম মাগফিরাত ও বিনম্র শ্রদ্ধা কামনা করি।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।