ঝটিকা মিছিলের আতঙ্ক ও বিস্ফোরক অডিও ফাঁস: এসবি প্রধানসহ পুলিশে বড় রদবদল। শীর্ষ পর্যায়ে ১১ পদে পরিবর্তন: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পুলিশের মাঠপর্যায়ে বাড়ছে অসন্তোষ
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আকস্মিক ‘ঝটিকা মিছিল’ প্রতিহত করতে না পারা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার খড়্গ নেমে আসায় দেশের সার্বিক পুলিশ প্রশাসনে চরম অস্থিরতা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে যখন শাস্তির আতঙ্ক বিরাজ করছে, ঠিক তখনই স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) প্রধানসহ উপপুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার ১১ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে একযোগে রদবদল করা হয়েছে। একই সাথে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও স্বরাষ্ট্র প্রশাসনের সমালোচনা-সংবলিত বিতর্কিত অডিও ফাঁসের ঘটনায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ঝটিকা মিছিল ঘিরে মাঠ প্রশাসনে শাস্তি ও ক্ষোভ
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের ঝটিকা মিছিল হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) নিতে হবে। এই কঠোর বার্তা বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করা হয়নি। সম্প্রতি গুলশানে আকস্মিক মিছিল বের হওয়ার অপরাধে গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং তার আগে প্রত্যাহার করা হয় গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যম সারির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোনো পূর্বতথ্য ছাড়া ১০-১২ জন লোক হঠাৎ রাস্তায় নেমে ২-৩ মিনিটের মিছিল করে সটকে পড়লে, কোনো ওসির পক্ষে তা তাৎক্ষণিক আটকানো বাস্তবসম্মত নয়। বিগত সরকারগুলোর আমলেও বিরোধী দলগুলো ঝটিকা মিছিল করলেও কখনো ওসি বা ডিসিদের এভাবে বরখাস্ত বা প্রত্যাহার করা হয়নি। কর্মকর্তাদের মতে, অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও এভাবে বলির পাঁঠা বানানো হলে মাঠপর্যায়ের পুলিশের মনোবলে চরম ধস নামবে। বিশেষজ্ঞদের মতেও এই নীতি হিতে বিপরীত হতে পারে। অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের ওপর মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করা ঠিক হচ্ছে না। পুলিশ যেখানে এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, সেখানে রাজনৈতিক বিষয়কে কঠোর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরোধ না করে কেবল প্রশাসনিক শাস্তি দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদার মতে, নিষিদ্ধ দলের অপতৎপরতা বন্ধ করা পুলিশের দায়িত্ব হলেও শুধু একক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কোনো সমাধান নয়। কারোর গাফিলতি বা ইন্ধন ছিল কি না, তা যাচাই না করে শাস্তির মুখোমুখি করা অন্যায়। একই মত প্রকাশ করে সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা জানান, গোয়েন্দা তথ্য বাড়িয়ে কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করার পরিবর্তে কেবল ভয় দেখিয়ে দায়িত্ব পালন করা যায় না।
অডিও ফাঁস: ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি প্রত্যাহার
অস্থিরতার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ক্লিপ। সেখানে ‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না’—এমন বিতর্কিত ও বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শোনা যায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে। অডিওর ওই ব্যক্তি রাজধানী ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসান বলে চিহ্নিত হওয়ার পর তাকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে ডিএমপির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়, রাস্তার পুলিশ বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা কেবল নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত। এতে অভিযোগ করা হয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ড্রাইভারদের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে ওসির পদায়ন কেনাবেচা হচ্ছে। এমনকি সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের আমলের উদাহরণ টেনে দাবি করা হয়, তৎকালীন সময়েও ওসির পদায়নে এত টাকার লেনদেন হতো না। ওসির অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্তারা নিজেরা কোটি টাকা ঘুষ নিলেও যোগ্য কর্মকর্তাদের কৌশলে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে। এই অডিও ফাঁসের ঘটনা পুরো প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এসবি প্রধানসহ শীর্ষ ১১ পদে রদবদল রাজনৈতিক চাপ ও মাঠপর্যায়ের বিশৃঙ্খলার মাঝেই গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনে ১১ জন শীর্ষ কর্মকর্তার পদায়ন ও বদলির আদেশ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে আদেশের কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’ উল্লেখ করা হলেও একে সাম্প্রতিক অস্থিরতারই অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তা পূর্ববর্তী পদ নতুন পদায়ন মো. কামরুল আহসান ডিআইজি, পুলিশ অধিদপ্তর অতিরিক্ত আইজিপি ও প্রধান, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) সরদার নুরুল আমিন অতিরিক্ত আইজিপি, এসবি অতিরিক্ত আইজিপি, পুলিশ অধিদপ্তর মো. ইকবাল হোসেন ডিআইজি, ঢাকা রেঞ্জ অতিরিক্ত আইজিপি, পুলিশ অধিদপ্তর মো. মোস্তাফিজুর রহমান ডিআইজি, খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি, ঢাকা রেঞ্জ মো. রেজাউল করিম ডিআইজি, পুলিশ অধিদপ্তর ডিআইজি, খুলনা রেঞ্জ মো. সায়েদুর রহমান ডিআইজি, সিপিএইচ অতিরিক্ত আইজিপি, পুলিশ অধিদপ্তর মোহাম্মদ মুসলিম ডিআইজি, অ্যান্টিটেররিজম ইউনিট পরিচালক, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল (সিপিএইচ) মো. মাইনুল হাসান অতিরিক্ত আইজিপি, ট্যুরিস্ট পুলিশ প্রিন্সিপাল, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি (সারদা) জি এম আজিজুর রহমান প্রিন্সিপাল, সারদা একাডেমি অতিরিক্ত আইজিপি, ট্যুরিস্ট পুলিশ মীর আশরাফ আলী ডিআইজি, এসবি ডিআইজি, রেলওয়ে পুলিশ সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান ডিআইজি, মেট্রোরেল ডিআইজি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)
সমন্বিত সমাধানের তাগিদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে টহল ও বিশেষ চেকপোস্ট বাড়িয়ে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায় ও শীর্ষপর্যায়ের সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বলপ্রয়োগ ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে পুলিশের শৃঙ্খলা কিংবা মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক চাপমুক্ত রেখে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনাই এখন পুলিশ প্রশাসনের মূল চ্যালেঞ্জ।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
রক্তাক্ত বাংলাদেশ ও সুশীল মুখোশের আড়ালে নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় ডাকাতি: ইউনূস সরকারের দেড় বছরের ভয়াবহ প্রতারণার চালচিত্র: আবেগের ছলে ক্ষমতার মোহ: এক মেটিকুলাস চক্রান্তের শিকার জাতি।
কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মোড়: পুতিন-হাসিনা ' ফোনালাপ' ও রূপপুর প্রকল্প ও দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ, ব্রিকস সম্মেলনের নেপথ্য আলোচনা ও বিশ্ব নেতাদের ভূমিকা
মুখোশের আড়ালে মহালুটপাট:ইউনূস সরকারের দেড় বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশী বিষবৃক্ষ