বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

আমার শৈশব, আমার কামাল: স্মৃতির পাতায় এক অমলিন নক্ষত্র

লিখেছেন: শেখ হাসিনা প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২৬, ৭:৩১ এএম
আমার শৈশব, আমার কামাল: স্মৃতির পাতায় এক অমলিন নক্ষত্র

সময় কত দ্রুত বয়ে যায়! আজ যদি কামাল আমাদের মাঝে থাকত, তবে তার বয়স হতো চুয়াত্তর বছর। আমার ছোট ভাই কামাল—যে শুধুই আমার অনুজ ছিল না, ছিল আমার শৈশব-কৈশোরের পরম সঙ্গী, দুঃখ-সুখের অংশীদার এবং জীবনের প্রতিটি মোড়ে এক পরম অনুপ্রেরণার নাম। কামালকে যখন মনে পড়ে, বুকের ভেতরটা এক গভীর শূন্যতায় হাহাকার করে ওঠে।

আমাদের ছোটবেলা কেটেছে আর দশটা সাধারণ শিশুর চেয়ে একটু আলাদাভাবে। আব্বা (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) তো বেশিরভাগ সময়ই থাকতেন কারাগারে। বাবাকে কাছে না পাওয়ার সেই দিনগুলোতে আমরা ভাই-বোনেরা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম। কামাল ছিল অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী, কিন্তু মনে ছিল এক শিশুসুলভ সরলতা। বড় ভাই হিসেবে ওর প্রতি আমার যে স্নেহ ছিল, ও সেটা ফিরিয়ে দিত পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়।

স্বাধীনতার আগে ও পরে, কামালের জীবন ছিল এক রঙিন ক্যানভাস। ও যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে পড়াশোনা করছে, তখন শুধুই বইয়ের পাতায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। সংস্কৃতি, রাজনীতি, খেলাধুলা—কোথায় ছিল না কামাল? 'স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ও আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির ধারায় এক নতুন সুর সংযোজন করেছিল। আবার নাটক বা বিতর্কের মঞ্চেও ওকে দেখা যেত সমান ছন্দে। ও বিশ্বাস করত, একটি স্বাধীন দেশের তরুণ সমাজকে গড়ে তুলতে হলে সংস্কৃতি ও খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই।

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে ও কোনো ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়নি। অত্যন্ত বিনয়ী, নির্লোভ ও নিরাভরণ জীবনযাপন করত ও। সাধারণ একজন মানুষের মতো অতিসহজে মিশে যেতে পারত যেকোনো রাজপথের পথচারী বা খেলার মাঠের কিশোরের সাথে। খেলাধুলার প্রতি তার যে উন্মাদের মতো ভালোবাসা ছিল, তা আজ ইতিহাসের অংশ। আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ও যে বিপ্লব এনেছিল, তা আমরা আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। খেলোয়াড়দের পেশাদার রূপ দেওয়া, বিদেশ থেকে আধুনিক কোচ নিয়ে আসা কিংবা খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আব্বার কাছ থেকে অনুদান এনে 'খেলোয়াড় কল্যাণ তহবিল' গঠন—সবই ছিল তার দূরদর্শী চিন্তার ফসল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত আমাদের জীবনের সব আলো নিভিয়ে দিল। ঘাতকের নির্মম বুলেট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ঢুকে প্রথমেই কেড়ে নিল আমার হাসিখুশি ভাইটির প্রাণ। শারীরিকভাবে ওরা কামালকে হত্যা করেছে ঠিকই, কিন্তু ওর রেখে যাওয়া স্বপ্ন, আদর্শ আর মূল্যবোধকে কি মুছে ফেলতে পেরেছে? পারেনি।

কামাল আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু ও আছে এ দেশের হাজারো তরুণের স্বপ্নে, আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিটি বিজয়ে, আর আমার অনুভূতির প্রতিটি ছত্রে। আজ ওর জন্মদিনে গভীর মমতা আর পরম স্নেহপরশে ওকে মনে করছি। আমার বিশ্বাস, কামালের অসমাপ্ত স্বপ্ন আর গঠনমূলক চিন্তাগুলোকে যদি আমাদের আজকের তরুণ প্রজন্ম ধারণ করতে পারে, তবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ একদিন ঠিকই তার শ্রেষ্ঠত্বের পতাকা উড়াবে।

কামাল, আমার ভাই—তুই যেখানেই থাকিস, শান্তিতে থাক। তোর রেখে যাওয়া আদর্শ আমাদের চিরকাল পথ দেখাবে।

লেখক: শেখ হাসিনা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি।