মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

'ইসলামিক ন্যাটো'র ব্যর্থতা এবং সৌদি আরবের নিঃসঙ্গতা । পরীক্ষার মুখে 'মক্কা জোট': পাকিস্তানের নীরবতা ও তুরস্কের স্বার্থনীতির পেছনের বাস্তবতা

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
'ইসলামিক ন্যাটো'র ব্যর্থতা এবং সৌদি আরবের নিঃসঙ্গতা । পরীক্ষার মুখে 'মক্কা জোট': পাকিস্তানের নীরবতা ও তুরস্কের স্বার্থনীতির পেছনের বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মিলে একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় সামরিক জোট গঠন করেছিল। বিশ্লেষকদের একাংশ একে ‘মক্কা জোট’ এবং অনেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে অভিহিত করতেন। এই চুক্তির মূল ও কঠোর শর্তটি ছিল ন্যাটের সমকক্ষ—জোটের যেকোনো একটি সদস্য দেশের ওপর আক্রমণকে বাকি সব সদস্যের ওপর যৌথ আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। সম্প্রতি সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি প্রথমবারের মতো এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। কিন্তু বাস্তবতার কষ্টিপাথরে চুক্তিটি পুরোপুরি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো এবং জনবসতি লক্ষ্য করে একের পর এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে সত্তরেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক আহত হন এবং দেশটির প্রধান তেল কেন্দ্রগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চুক্তি অনুযায়ী মিত্রদের সাহায্য পাওয়ার অধিকার থাকলেও, সৌদি আরবকে সম্পূর্ণ একাই উত্তর ইয়েমেনের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালাতে হয়। চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান বা তুরস্কের পক্ষ থেকে কোনো সৈন্য বা কার্যকর সামরিক সহায়তা সৌদি ভূখণ্ডে পৌঁছায়নি। কাগজ-কলমে সুদৃঢ় সামরিক জোটের সদস্য হয়েও রিয়াদকে একাকী যুদ্ধ পরিচালনা করতে হলো।

এই সংকটে পাকিস্তানের ভূমিকা সামরিক জোটটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। পাকিস্তানের সরকার দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক জোটে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও বাস্তব সহায়তার ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই পিছু হটেছে। এর পেছনে পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:

• অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট: পাকিস্তান বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, আইএমএফের ঋণনির্ভরতা এবং সীমান্তজুড়ে অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াইয়ে ব্যস্ত। ইয়েমেনের জটিল যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পাঠানো বা বিশাল আর্থিক ব্যয়ভার বহন করার মতো রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা ইসলামাবাদে নেই। • কূটনৈতিক অবস্থান: মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বা আঞ্চলিক সংঘাতগুলোতে পাকিস্তান সরাসরি পক্ষ নেওয়ার চেয়ে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কোনো সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানকারী হতে চাইলে সরাসরি সামরিক হামলায় অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। যে দেশ নিজ দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, তার পক্ষে মিত্রদের সামরিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া একটি ফাঁপা নীতি মাত্র।

অন্যদিকে, এই সংকটে তুরস্কের নীরবতার নেপথ্যে রয়েছে রিয়েলপলিটিক বা কঠোর বাস্তবতাভিত্তিক স্বার্থনীতি। আঙ্কারার কাছে এই 'ইসলামিক ন্যাটো' কখনোই প্রকৃত সামরিক দায়বদ্ধতার প্রতীক ছিল না; বরং আঞ্চলিক ক্ষমতা ও প্রভাব বলয় বিস্তারের একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার মাত্র।

• কৌশলগত হিসাব-নিকাশ: সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে জোটের মাধ্যমে মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়কে নিজের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব দেখানোই ছিল তুরস্কের মূল উদ্দেশ্য। • ক্ষতি ও সুবিধার অনুপাত: ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামলে তুরস্কের জাতীয় স্বার্থে বড় ধরণের কোনো লাভ নেই, বরং আর্থিক ও সামরিক ক্ষতির ঝুঁকি ব্যাপক। যেকোনো হিসাবি রাষ্ট্র যে সিদ্ধান্ত নিত, তুরস্ক ঠিক তা-ই করেছে—অন্যের যুদ্ধে নিজেদের সম্পদে ঝুঁকি নিতে সরাসরি অস্বীকার করেছে।

অনেক বিশ্লেষক হয়তো যুক্তি দিতে পারেন যে এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি কোনো অনিয়মিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং নির্দিষ্ট সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য। কিন্তু এই যুক্তি মূলত চুক্তির মৌলিক দুর্বলতাকেই উন্মোচন করে। রিয়াদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাস্তব নিরাপত্তা হুমকি হলো এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এই প্রত্যক্ষ হুমকির সময়েই যদি চুক্তি কার্যকর না হয়, তবে সেই সামরিক জোটের বাস্তবিক কোনো মূল্য থাকে না।

বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার এই নাজুক সময়ে সৌদির এই নিঃসঙ্গতা একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। ওয়াশিংটনের সাথে দূরত্ব তৈরি করে রিয়াদ যখন পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো নতুন আঞ্চলিক মিত্রদের দিকে ঝুঁকছিল, তখন প্রথম বাস্তব পরীক্ষাতেই মিত্ররা পিছু হটল। এই ঘটনাটি ভূ-রাজনীতির সেই চিরন্তন সত্যটিই আবার স্মরণ করিয়ে দেয়—কেবল চুক্তির কাগজে সই করলেই প্রকৃত মিত্রতা তৈরি হয় না। বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ও ইচ্ছাই জোটের আসল ভিত্তি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, প্রতিষ্ঠার পরপরই প্রথম পরীক্ষায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে 'ইসলামিক ন্যাটো' এখন কেবল কাগজের দলিলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)