রক্তে ভেজা প্রবাস ও বধির রাষ্ট্রযন্ত্র: দুই তরুণের ট্র্যাজেডি এবং আমাদের বুকের গভীর ক্ষত
মাটির নিচে শেষ ঘুমে আচ্ছন্ন দুই প্রবাসী সন্তান, আর মাটির উপরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের নিঃশব্দ হাহাকার—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন জাগে, ভিনদেশের নিজেদের সলতে বানিয়ে দেওয়া এই প্রবাসীরা কি তবে শুধুই কাগজের নোট? গত ১৮ অক্টোবর যখন সৌদি আরবের বুক থেকে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের গোপনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর চাউর হলো, তখন তা কেবল দুটি প্রাণের ইতি ঘটায়নি, বরং তাসের ঘরের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমাদের তথাকথিত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার মিথ্যা আশ্বাসকে।
রক্তের ফোঁটা ও রাষ্ট্রের নিস্তব্ধতা
যে দেশে কোনো প্রবাসীর ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্সে অর্থনীতির চাকা ঘোরে, সেই রাষ্ট্র নিজের সন্তানের মৃত্যুর খবরটুকু পর্যন্ত জানতে পারে ঘটনা ঘটার পর! ভিয়া প্রটোকল কিংবা কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে ভিনদেশের মাটিতে দুটো প্রাণ ঝরে গেল, আর আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্তারা জানলেন সবার শেষে।
যে সন্তানের উপার্জনে দেশের পরিবারগুলোর উনুন জ্বলে, বিপদের দিনে সেই সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর মতো ইচ্ছাশক্তি ও নৈতিক সাহস কি আজ আমাদের পররাষ্ট্রনীতির একদমই নেই? ক্ষমতা কেবল অর্থ বা অস্ত্রের নয়; একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার নিঃশ্বাসের মতো আগলে রাখা প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষায়। কিন্তু আজ সেই সুরক্ষার জায়গায় বাসা বেঁধেছে চরম অসহায়ত্ব ও উদাসীনতা।
তথ্যের কুয়াশা এবং গণমাধ্যমের হৃদয়হীনতা
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, প্রবাসের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ঠিক কী ঘটেছিল—তা আজও রয়ে গেল অজানা। সোশ্যাল মিডিয়ায় নানামুখী মুখরোচক আলোচনা ও নানা খবর ভেসে বেড়ালেও, আজ পর্যন্ত কোনো অনুসন্ধানী চোখ ওই দুই তরুণের বাড়ি গিয়ে স্বজনদের চোখের জলটুকু মুছে সত্যটা জানার তাগিদ অনুভব করেনি।
কোথায় ঘটেছিল সেই কথিত ঘটনা? কোনো গোপন ক্যামেরার ভুলচিত্রে তাঁদের বলির পাঁঠা বানানো হয়েছিল কি না—এমন নানা গুঞ্জন বাতাসে ভাসলেও সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই কারও কাছে। সত্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবেই আটকা পড়ে রইল দুটি তাজা প্রাণের করুণ পরিণতি।
জনপ্রতিনিধিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য
স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে যখন পুরো বিশ্ব আঁধার হয়ে এসেছে, ঠিক তখনই দায়িত্বশীলদের মন্তব্য তাঁদের বুকে নতুন করে ছুরি চালিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা যখন আত্মপক্ষ সমর্থনে দেশবাসীকে "শিক্ষা নেওয়ার" নসিহত দেন, কিংবা প্রবাসে প্রাণ হারানো নিজ দেশের সন্তানের লাশ গ্রহণ না করার মতো নির্মম মন্তব্য ছুঁড়ে দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষের হৃদয় কেঁদে ওঠে।
যে জনপ্রতিনিধিদের কাজ হওয়ার কথা ছিল প্রবাসীদের চোখের জল মোছা এবং রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক শক্তি দিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নাগরিককে রক্ষা করা, তাঁদের মুখে এমন নির্লজ্জ ও সংবেদনহীন ভাষা একটি জাতির সামাজিক ও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাই উন্মোচিত করে।
"আজ প্রবাসীদের রক্তে অর্জিত টাকাকে আমরা পরম শ্রদ্ধায় গ্রহণ করি, কিন্তু সেই প্রবাসীর জীবন যখন ভিনদেশের বিচারহীনতার মুখে পড়ে, তখন আমরা মুখ ফিরিয়ে নিই। একটি রাষ্ট্র যখন তার নিঃস্ব সন্তানের মর্যাদাকে প্রদীপের নিচে বিসর্জন দেয়, তখন জাতীয় পতাকার সম্মানও ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে।"
প্রবাসীদের আর্তনাদ ও জাতীয় আত্মসম্মানের দাবি
আজ সময় এসেছে এই নিস্তব্ধতা ও নির্লিপ্ততা ভাঙার। প্রবাসীদের রক্ত ও ঘামে গড়া এই বাংলাদেশ আর কতকাল নিজ সন্তানের আত্মাহুতি নীরব দর্শকের মতো দেখে যাবে? আজ আমাদের প্রয়োজন এমন এক পররাষ্ট্রনীতি ও নেতৃত্ব, যা অহংকার বা আগ্রাসনে নয়—বরং শক্তিশালী কূটনীতি, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং নিজ দেশের মানুষের সুরক্ষায় আপসহীন অবস্থানের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজের সম্মান আদায় করে নেবে।
মরুর বুকে ঝরে যাওয়া দুটি প্রাণের এই নিঃশব্দ কান্না যেন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়—আর যেন কোনো প্রবাসীকে নিজের রাষ্ট্রের অবহেলায় ভিনদেশের মাটিতে নিঃশেষ হতে না হয়।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
নেপথ্যের কারিগর বনাম জনতা: বাংলাদেশের ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ও সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতার সংকট
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক বিমানে ভারতে যাত্রা এবং গোপনীয়তার প্রশ্ন; ভিডিও ধারণের জেরে চাকরিচ্যুতি, কোর্ট মার্শাল ও এক কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক
মৃত্যুর পরও মুক্তি নেই একাত্তরের বীরের: এ কেমন বাংলাদেশ যেখানে মুক্তিযোদ্ধার কবর খোঁড়ার জন্য বিচারে মুখোমুখি হতে হয়।