মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

'মৃত্যুদণ্ড থাকলেও ভয় আমার কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে না': বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে নিউজ ১৮ ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা

লিখেছেন: সাক্ষাৎকার : শেখ হাসিনা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা।সাক্ষাৎকারটি বাংলা করেছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী,রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
'মৃত্যুদণ্ড থাকলেও ভয় আমার কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে না': বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে নিউজ ১৮ ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা। শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, দেশটির অন্যতম একটি সংকটময় সময়ে জনগণের "পাশে দাঁড়ানোর" ইচ্ছা থেকেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এক মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে ফেরার এবং আদালতের মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। নিউজ১৮ ইন্ডিয়া-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ আলাপে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের এক অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে জনগণের "পাশে দাঁড়ানোর" ইচ্ছা থেকেই তার এই সিদ্ধান্ত। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে তিনি আইনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত, তবে যেকোনো বিচার অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে এবং পূর্বনির্ধারিত রায়ের ওপর ভিত্তি করে হতে পারবে না।

বাংলাদেশের বাইরে কাটানো প্রায় দুই বছর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তোলেন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। একই সাথে বর্তমান সরকার কিংবা বিএনপির সাথে কোনো গোপন সমঝোতার গুঞ্জনও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। হাসিনা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, নিজের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার পরিস্থিতি এবং ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে তার প্রত্যাশার কথা বলেন। তিনি বলেন, তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য নয়, বরং তার সমর্থকদের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।

প্রশ্ন: আপনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আপনি কি এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

শেখ হাসিনা: বাংলাদেশ আমার দেশ। আমি আমার পুরো রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের মানুষের সাথে কাটিয়েছি। আমি কারাবরণ, নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা এবং বারংবার হুমকির মুখোমুখি হয়েছি। যখন আমার দেশের মানুষ আমাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে, তখন দেশের বাইরে থাকার জন্য আমি রাজনীতিতে আসিনি। এ কারণেই আমি ফিরতে চাই। এই গুরুগম্ভীর পরিস্থিতিতে আমি আমার মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। আমি আদালতের মুখোমুখি হতে এবং নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে প্রস্তুত। কিন্তু বিচার অর্থ পূর্বনির্ধারিত রায় হতে পারে না।

প্রশ্ন: আপনার সিদ্ধান্ত যদি চূড়ান্ত হয়ে থাকে, তবে সেই প্রক্রিয়াটি কেমন হবে? আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা কি আগে ফিরবেন, আপনি নিজে নেতৃত্ব দিয়ে ফিরবেন, নাকি আপনারা সবাই একসাথে ফিরবেন?

শেখ হাসিনা: ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সাধারণ সমর্থকরা গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা, চাকরিচ্যুত করা, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অনেকেই ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তারা অপরাধী নন; তারা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার। কে আগে ফিরবেন, কিংবা নেতারা একসাথে নাকি ধাপে ধাপে ফিরবেন—তা একটি ব্যবহারিক ও সাংগঠনিক বিষয়। দায়িত্বশীলতার সাথেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে রাজনৈতিক নীতি স্পষ্ট: আমরা বাংলাদেশ ছাড়ব না। আমরা আমাদের মানুষকে ছেড়ে যাব না। আমরা গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ত্যাগ করব না। আওয়ামী লীগ জনগণের কাছেই ফিরে আসবে, কারণ আমাদের রাজনীতি জনগণের জন্যই।

প্রশ্ন: আইনি ও রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ কী?

শেখ হাসিনা: কারণটি খুবই সহজ: বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। আমার পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মানুষের জন্য জীবন দিয়েছেন। আমার মা, আমার ভাই এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে বাংলাদেশের মাটিতে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক জীবন সেই দেশের সেবায় উৎসর্গ করেছি। আমার শিকড় সেখানে। আমার মানুষ সেখানে। আমার কর্তব্য সেখানে।

লাখ লাখ আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সাধারণ নাগরিকের সাথে এমন আচরণ করা হচ্ছে যেন তাদের নিজ দেশে কোনো বৈধ স্থান নেই। আমার মানুষ যখন ভয়, বর্জন ও নিপীড়নের মুখোমুখি, তখন আমি বাংলাদেশের বাইরে থাকতে পারি না। আমার ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়। এটি দায়িত্ববোধের বিষয়। এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আইনের মুখোমুখি হওয়া এবং বাংলাদেশের মানুষকে আমার বিচার করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়।

আমার মেয়াদে বাংলাদেশ ও তার জনগণের কল্যাণে আমি যা সম্ভব সবই করেছি। সাধারণ মানুষের কল্যাণই সবসময় আমার রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিল। বাংলাদেশকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আমরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন এবং সুসংহত আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করেছি।

আমরা পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, এক্সপ্রেসওয়ে, সড়ক, সেতু, বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বড় বড় জাতীয় প্রকল্প নির্মাণ করেছি। আমরা প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। আমরা কমিউনিটি ক্লিনিক প্রসারিত করেছি যাতে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষ তাদের বাড়ির কাছে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ পেতে পারে। আমরা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করেছি, ভূমিহীন পরিবারগুলোকে ঘর ও জীবিকার সুযোগ দিয়েছি, শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছি, নারীর ক্ষমতায়নে সহায়তা করেছি এবং বিশ্বে বাংলাদেশকে এক নতুন মর্যাদায় ভূষিত করেছি।

অর্থনীতি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২,৭৮৪ ডলারে দাঁড়িয়েছিল। দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে কমে ১৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। চরম দারিদ্র্য ২৫.১ শতাংশ থেকে কমে ৫.৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩,৭৮২ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২৮,০০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়েছিল। মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, নিরাপদ খাওয়ার পানি ও স্যানিটেশনের সুযোগ বেড়েছে এবং গড় আয়ু ৫৯ বছর থেকে বেড়ে ৭৩ বছর হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর কী ঘটেছে তা দেখুন। ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.২২ শতাংশ থেকে কমে ৩.১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের অনুপাত ৩৯.৭০ শতাংশ থেকে কমে ৯.৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে। খেলাপি ঋণ ১০.৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৮.২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দারিদ্র্য ১৮.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৯.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। চরম দারিদ্র্য ৫.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭.৭ শতাংশ হয়েছে। বেকারত্ব ৩.৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮.৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। দুই বছরে ৮৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় ১,৯২,০০০ মানুষ সরাসরি কাজ হারিয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও মানুষের অধিকার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ কারণেই আমি ফিরতে চাই। আমার ফেরা মানুষের অধিকার পুনর্বহালের সংগ্রামেরই অংশ।

প্রশ্ন: আপনি প্রকাশ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে আপনি ফিরলে আপনার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সেই উদ্বেগের পর সত্ত্বেও কেন আপনি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

শেখ হাসিনা: ভয় আমার কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে না। আমার জীবনের ওপর ১৯ বার হামলা হয়েছে। আমার পরিবারকে হত্যা করা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা থেকে আমি বেঁচে ফিরেছি, যে হামলার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে হত্যা করা এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ধ্বংস করা। সেখানে ২৪ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছিলেন।

আমি কারাবরণ, সামরিক শাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং বারবার হুমকির মুখোমুখি হয়েছি। তাই আমি ঝুঁকি বুঝতে পারি। কিন্তু রাজনৈতিক জীবনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই একমাত্র বিবেচ্য হতে পারে না। আমার মানুষের থেকে দূরে বেঁচে থাকার চেয়ে আমি বরং দেশে ফিরে যারই মুখোমুখি হতে হোক না কেন, তা মেনে নেব।

প্রশ্ন: আপনার বিরুদ্ধে থাকা একটি মামলায় আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আপনি কি চিন্তিত যে আপনি ফিরলে বর্তমান কর্তৃপক্ষ সেই রায় কার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে?

শেখ হাসিনা: আমি আমার জীবন নিয়ে চিন্তিত নই। আমি বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। যা আমাকে চিন্তিত করে তা হলো বিচারের ধ্বংসসাধন। যা আমাকে চিন্তিত করে তা হলো রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য আদালত, আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহার। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডকে সত্যের চূড়ান্ত কথা হিসেবে গণ্য করা যায় না। একটি সাধারণ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রকৃত সুযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযুক্তের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া, উপযুক্ত প্রতিরক্ষা ছাড়া এবং রাজনৈতিক চাপে দেওয়া রায় বিচার হতে পারে না।

আমার বিরুদ্ধে এখন যে আইনটি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠিত নৃশংসতার শিকারদের বিচার পাওয়ার জন্য আমার মেয়াদেই তৈরি করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ যদি সত্যিই বিচারে বিশ্বাস করে, তবে তাদের একটি উন্মুক্ত, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।

আমাকে আদালতে হাজির হতে দিন। আমাকে প্রমাণ উপস্থাপন করতে দিন। আমার আইনজীবীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিন। সাক্ষীদের জেরা করতে দিন। প্রমাণকেই কথা বলতে দিন।

প্রশ্ন: আপনার বা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে বর্তমান সরকার বা বিএনপির কোনো গোপন আলোচনা হয়েছে কি আপনার ফেরার সম্ভাবনা বা শর্তাবলী নিয়ে?

শেখ হাসিনা: ফেরার সিদ্ধান্ত আমার নিজস্ব, এবং এটি আমার দলের ভেতরের রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়। ঢাকা সরকারের সাথে আমার কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা নেই। যারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে, আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দিয়েছে এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত করেছে—তারা কোনো গোপন সমঝোতার অংশীদার হতে পারে না।

আমার অবস্থান পরিষ্কার: আমি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ফিরে যেতে চাই কারণ তারা ভয়, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অধিকারহীনতার মধ্যে বাস করছে। তাদের পাশে দাঁড়ানোই আমার কর্তব্য।

প্রশ্ন: আপনি কি বিনাশর্তে ফিরবেন, নাকি বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে কিছু নিশ্চয়তা আশা করছেন, যেমন উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা বা সুষ্ঠু বিচার? শেখ হাসিনা: সংবিধান ও আইনের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের জন্য যেটুকু পাওয়ার অধিকার রয়েছে, আমি কেবল সেটাই আশা করি: ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আইনজীবীদের সুযোগ পাওয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ, স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া এবং সুষ্ঠু শুনানি।

এগুলো কোনো রাজনৈতিক শর্ত নয়। এগুলো আইনের শাসনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা।

সরকার যদি বলে, "ফিরে এসো এবং বিচারের মুখোমুখি হও," তবে আমি বলব, "আমি ফিরে আসতে প্রস্তুত।" তবে বিচার বলতে বিচারই বোঝাতে হবে, কোনো পূর্বনির্ধারিত শাস্তি নয়।

প্রশ্ন: আপনি কি আপনার ফেরার পরিকল্পনা ভারত সরকারের সাথে শেয়ার করেছেন? যদি করে থাকেন, তবে ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল, বিশেষ করে আপনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধের আলোকে?

শেখ হাসিনা: ভারত একটি সার্বভৌম দেশ, এবং আমি ভারত সরকারের পক্ষ হয়ে কথা বলব না। আমার ধারণা, ভারত তার নিজস্ব আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যর্পণের প্রশ্নটিকে একটি আইনি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে। সেটা ভারতের সামলানোর বিষয়।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের বন্ধুত্বকে আমি সবসময় মূল্যায়ন করেছি। তবে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আমার নিজস্ব রাজনৈতিক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত। ভারত আমাদের বন্ধু, কিন্তু বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। আমি অনির্দিষ্টকালের জন্য আমার দেশের বাইরে থাকতে পারি না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধই রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আপনি আপনার দলের জন্য কী ভবিষ্যৎ দেখছেন, এবং দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এর অংশগ্রহণকে কীভাবে দেখছেন? শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ শুধু কোনো কার্যালয়ে বা কাগজে টিকে নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় এর শিকড় রয়েছে। এটি স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। এটি সংবিধান প্রণয়ন করেছে। যুদ্ধের পর দেশকে পুনর্গঠন করেছে। এটি বাংলাদেশ শাসন করেছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন করেছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লাখ লাখ মানুষের সেবা করেছে।

প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে, প্রতিটি পেশায় এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে এর সমর্থক রয়েছে। এই কঠিন সময়েও, নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি ও সহিংসতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জনগণের পক্ষে আওয়াজ তুলছেন। তারা নিপীড়ন, চরমপন্থা, ইতিহাসের বিকৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলা রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের বিরুদ্ধে যথাসম্ভব প্রতিবাদ করছেন।

প্রশাসনিকভাবে আপনি একটি সংস্থাকে নিষিদ্ধ করতে পারেন, কিন্তু অধ্যাদেশ জারি করে লাখ লাখ নাগরিকের বিশ্বাস মুছে ফেলতে পারবেন না। আমাদের উদ্দেশ্য হলো আওয়ামী লীগ সমর্থকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা: সংগঠন করা, কথা বলা, প্রচারণা চালানো এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়া।

সরকার যদি মনে করে যে জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখান করেছে, তবে সিদ্ধান্ত জনগণের ওপরই ছেড়ে দিক। নিষেধাজ্ঞা তুলে নিন। নিপীড়ন বন্ধ করুন। কোনো ব্যক্তি বা দলকে তারা চায়, তা বেছে নেওয়ার সুযোগ জনগণকে দিন। পারলে ব্যালট বাক্সে আমাদের পরাজিত করুন। সেটাই হলো গণতন্ত্র।

প্রশ্ন: আপনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়গুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছেন। আপনি কি ফিরলে একটি নতুন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারের দাবি জানাবেন? আপনি সুনির্দিষ্টভাবে কী ধরনের আইনি বা বিচারিক নিশ্চয়তা চাইবেন?

শেখ হাসিনা: হ্যাঁ, আমি একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানাব। আমাকে আদালতে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হওয়ার, যোগ্য আইনি প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার, প্রমাণ পরীক্ষা ও চ্যালেঞ্জ করার, আইনানুযায়ী সাক্ষীদের জেরা করার, প্রাসঙ্গিক নথিপত্র পাওয়ার, প্রসিকিউশন ও বিবাদীর মধ্যে সমান আচরণ পাওয়ার, স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া এবং আইন অনুযায়ী আপিল করার অধিকার চর্চার সুযোগ দিতে হবে। এটাই হলো উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া

আমি মানুষকে এটিও মনে করিয়ে দিতে চাই যে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন সহিংসতা শুরু হয়েছিল, তখন প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি গুলিবর্ষণ এবং সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার তদন্তের জন্য আমি ১৮ জুলাই একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলাম। পরবর্তীতে আমি সেই কমিশনকে আরও সম্প্রসারিত করি। আমি যদি সত্য লুকাতে চাইতাম, তবে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কেন বিচার বিভাগীয় তদন্ত গঠন ও শক্তিশালী করতে গেলাম?

৫ আগস্টের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই বিচার বিভাগীয় তদন্ত বন্ধ করে দেয়। তিনি সত্য প্রকাশ হতে দেননি। তারা সহিংসতায় জড়িতদের দায়মুক্তি দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক ফরেনসিক সত্য, ময়নাতদন্তের প্রমাণ এবং দাপ্তরিক নথিপত্র পরীক্ষার কাজ এগোতে দেওয়া হয়নি। এটি নিজেই সত্য প্রকাশ করে। যারা সত্যিই বিচার চায়, তারা তদন্ত বন্ধ করে না। তারা প্রমাণ মাটিচাপা দেয় না। যারা হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতায় জড়িত ছিল, তাদের দায়মুক্তি দেয় না।

নীতিটি সহজ: আপনি যদি বিচারে বিশ্বাস করেন, তবে অভিযুক্তকে আদালতের সামনে দাঁড়াতে দিন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিন। প্রমাণ পরীক্ষা করতে দিন। সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ দিন। যে প্রক্রিয়া অভিযুক্তকে স্তব্ধ করে দেয়, তদন্ত বন্ধ করে এবং দায়মুক্তি দেয়, তা বিচার নয়। তা আইনের পোশাক পরা রাজনৈতিক প্রতিশোধ।

প্রশ্ন: আপনি যেহেতু সম্ভাব্য ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী? বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে তারা কী ভূমিকা পালন করুক বলে আপনি চান?

শেখ হাসিনা: বাংলাদেশকেই তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশ কে শাসন করবে তা নির্ধারণ করার জন্য আমি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রকে অনুরোধ করছি না। তবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া হলো সর্বজনীন নীতি। এই নীতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বৈধ ভূমিকা রয়েছে। একটি সার্বভৌম দেশ এবং আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে ভারত বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের কাছে আমার প্রত্যাশা কেবলই বন্ধুত্ব।

বাংলাদেশ তার সকল নাগরিকের, যার মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থকরাও অন্তর্ভুক্ত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে জনগণকেই। কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন নয়। কোনো অনির্বাচিত কর্তৃপক্ষ নয়।

আমার ফেরা আমার ব্যক্তিগত মামলার চেয়েও বড় বিষয়। প্রশ্নটা হলো, বাংলাদেশ কি এমন এক দেশ হবে যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিস্পত্তি হবে নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, নাকি বর্জন ও প্রতিশোধের মাধ্যমে।

সাক্ষাৎকারটি বাংলা করেছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী,রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।