মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

‘ভয় আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করে না’ ঝুঁকি নিয়েই দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার: ত্যাগী কর্মীদের আশা বনাম পলাতক নেতাদের কৌশল

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩২ পিএম
‘ভয় আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করে না’ ঝুঁকি নিয়েই দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার: ত্যাগী কর্মীদের আশা বনাম পলাতক নেতাদের কৌশল

‘মৃত্যু বা ভয় আমার রাজনৈতিক দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না। আমি আগামী ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরছি।’ ভারতে আশ্রিত অবস্থান থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘নিউজ১৮’-কে দেওয়া এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে এই সোজাসাপ্টা বার্তা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাথায় মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং দেশে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই তাঁর এই সরাসরি ফেরার ঘোষণা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

গোপন সমঝোতা নয়, আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে জানান, কোনো গোপন সমঝোতা বা ‘ব্যাকচ্যানেল’ বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে তিনি ফিরছেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের আইনকে এখন তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি কোনো বিশেষ অনুগ্রহ চান না; বরং সংবিধানে বর্ণিত একজন নাগরিকের স্বাধীন ও স্বচ্ছ বিচার লাভের অধিকার দাবি করেন।

অর্থনৈতিক অর্জন ও বর্তমান সংকটের পরিসংখ্যান নিজের ১৭ বছরের শাসনামলের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা দাবি করেন, তাঁর আমলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করা হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন:

• অর্থনীতির আকার: ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। • মাথাপিছু আয়: ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২,৭৮৪ ডলারে উন্নীত হয়। • দারিদ্র্যের হার: ৪১% থেকে কমে ১৮.৭% এবং চরম দারিদ্র্য ৫.৬%-এ নেমে আসে। • বিদ্যুৎ উৎপাদন:

• ৩,৭৮২ মেগাওয়াট থেকে ২৮,০০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়। এর বিপরীতে ২০২৪ পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বর্তমান সংকটের চিত্র আঁকেন। তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.১৪%-এ নেমে এসেছে, বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কমে ৯.৯৩% হয়েছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮.২৬%-এ। একইসঙ্গে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

নিপীড়ন, বিচার কমিশন ও দলের শিকড় আওয়ামী লীগের ওপর প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো কেবল কাগজে কলমে থাকা দল নয়, এর শেকড় দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রোথিত। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা সম্পর্কে তিনি জানান, ১৮ জুলাই তাঁর সরকার একটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন বন্ধ করে সত্য উদ্ঘাটনে বাধা দেওয়া হলো কেন?

তৃণমূলের দুর্ভোগ বনাম বিদেশে পলাতক নেতাদের বিলাসী অবস্থান

বর্তমানে আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের কিছু নেতা বিদেশে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করছেন এবং সুবিধাজনক পরিস্থিতির অপেক্ষা করছেন। অন্যদিকে, দলের মূল কাণ্ডারি ও সাধারণ হাজার হাজার নেতাকর্মী দেশের ভেতরেই অবরুদ্ধ, গৃহহীন ও আইনি নিপীড়নের মুখে কঠিন দিন কাটাচ্ছেন। তৃণমূলের এই কর্মী-সমর্থকদের বিশ্বাস, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। তবে বিদেশে অবস্থানরত সুবিধাবাদী নেতারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কয়েক বছর পর ক্ষমতার সুবাতাস পেলে ফিরতে চান কি না—তা নিয়ে ত্যাগী কর্মীদের মনে ক্ষোভ ও বড় প্রশ্ন রয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের তোয়াক্কা না করে শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনবার্তা আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট ও ভূ-রাজনীতিতে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)