শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

‘জনদাবি’র রাজনীতির নামে কী হতে যাচ্ছে দেশে !

লিখেছেন: নীহারিকা রায় প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬, ৫:৪৯ পিএম
‘জনদাবি’র রাজনীতির নামে কী হতে যাচ্ছে দেশে !

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও রাজনীতিতে ‘জনদাবি’ বা ‘জনস্বার্থ’ শব্দ দুটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। সাধারণত সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রয়োজন, স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাই ‘জনদাবি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সময়ে এই শব্দগুলোর ব্যবহার ও প্রয়োগ কতটুকু নিরপেক্ষ, আর কতটুকু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতির বিচার, আইনি পরিবর্তন এবং মাঠপর্যায়ের জনসমর্থনের বাস্তব চিত্রের আলোকে 'জনদাবি' ধারণার বস্তুনিষ্ঠতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি যাচাই-বাছাই করে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার ওপর দেশের মানুষকে আস্থা রাখতে হবে। একদিকে যেমন জনদাবিকে প্রাধান্য দেয়া হবে, অন্যদিকে কেউ যেন অন্যায় বিচারের শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা হবে। আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, সার্বিক বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইনকিলাব মঞ্চের মতো সংগঠনগুলো সাবেক রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছে। আইনমন্ত্রী যেহেতু ‘জনদাবি’র কথা বলেছেন, তাই জনদাবি প্রকৃতপক্ষে কী—তা বুঝে নেওয়া জরুরি। সহজ কথায়, জনদাবি হলো সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ (জনস্বার্থ), অধিকার বা কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে সম্মিলিত ও জোরালো আহ্বান। এটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়, বরং গোটা সমাজের কল্যাণে সাধারণ মানুষের ভেতর থেকে উঠে আসে এবং নীতি-নির্ধারকদের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। তবে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ে ‘জনদাবি’র নামে আয়োজিত বিভিন্ন আন্দোলন ও তার প্রভাব তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০২৫ সালের মে মাসে 'ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য'-এর ব্যানারে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন করা হয়। পরবর্তীতে ১০ ও ১২ মে সরকার ও নির্বাচন কমিশন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত করে, যা পরবর্তীতে সংসদে আইনে পরিণত হয়। একই সাথে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলীর বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে রাজনৈতিক দলের বিচারের বিধান যুক্ত করার দাবিও ওঠে। কিন্তু রাজপথের এসব দাবির বিপরীতে মাঠপর্যায়ের জনসম্পৃক্ততার চিত্রটি কেমন? সম্প্রতি রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের স্মরণসভার দৃশ্যটি এক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আয়োজিত এই সভায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত নগণ্য, যা নিয়ে খোদ মন্ত্রীও হতাশা প্রকাশ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নাগরিক সাংবাদিক, পুলিশ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মী মিলে পুরো অনুষ্ঠানে ৫০০ লোকের সমাগম হয়েছিল কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ঢাকা হলে হয়তো কৃত্রিমভাবে লোক ভাড়া করে এনে ভিড় বাড়ানো যেত, কিন্তু রংপুরের মতো জায়গায় সেই সুযোগ ছিল না। মূলত দীর্ঘদিন ধরেই ‘জনদাবি’ বা ‘জনস্বার্থ’ শব্দগুলোর অপব্যবহার হয়ে আসছে, যা বিগত অভ্যুত্থানের পর আরও প্রকট রূপ নিয়েছে। অতীতে দেখা যেত, কোনো সরকারি আমলা গুরুতর নৈতিক অপরাধ বা দুর্নীতির কারণে জনরোষে পড়লে তাকে "জনস্বার্থে" অন্য কোথাও বদলি করা হতো—যেন অন্য জায়গায় জনস্বার্থের কোনো তোয়াক্কা নেই! আর বর্তমানে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এমন যে, সরকার কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নিতে চাইলে ছোট ছোট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে দিয়ে একটি ছোট জমায়েত তৈরি করিয়ে সেটিকে ‘জনদাবি’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ওয়াকিফহাল মহল ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন কিংবা সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে মুখ খোলা থেকে বিরত রাখার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই এখন নতুন করে এই ‘জনদাবি’ তত্ত্বের অবতারণা করা হচ্ছে। জনগণ এবং জনদাবি যেকোনো দেশের রাজনীতির শেষ কথা হওয়া উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক সুবিধাহাসিল বা ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে যখন কৃত্রিম উপায়ে জনদাবির জোগান দেওয়া হয়, তখন প্রকৃত গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবু সাঈদের মতো শহীদ দাবীদারদের স্মরণসভায় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অভাব এবং অন্যদিকে প্রেস ব্রিফিংনির্ভর তথাকথিত 'জনদাবি'র উত্থান—এই দুইয়ের মধ্যকার বৈপরীত্যই বলে দেয় রাজনীতিতে কতখানি কৃত্রিমতা ভর করেছে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত কৃত্রিম জনদাবির আশ্রয় না নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রকৃত মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করা এবং স্বচ্ছতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা করা।

লেখক: নীহারিকা রায়,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট