শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

গোর-ত্রিবেদী রুদ্ধদ্বার বৈঠক: হঠাৎ কক্সবাজার সফর পেছানো ও দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির নতুন হিসাব-নিকাশ

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ১ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৬ এএম
গোর-ত্রিবেদী রুদ্ধদ্বার বৈঠক: হঠাৎ কক্সবাজার সফর পেছানো ও দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির নতুন হিসাব-নিকাশ

ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিনে মার্কিন প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও আঞ্চলিক নীতির এক তাৎপর্যপূর্ণ মোড় লক্ষ্য করা গেল। ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর শুক্রবার ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে এক জরুরি ও অনির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এই বৈঠকের কারণে মার্কিন প্রতিনিধির পূর্বনির্ধারিত কক্সবাজার সফর কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে যায়, যা দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি এবং ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি-ঢাকা ত্রিমুখী সম্পর্কের সমীকরণে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। ১. নির্ধারিত সময়সূচিতে আকস্মিক পরিবর্তন ও সময়সীমার তাৎপর্য সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের মূল তালিকার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন এবং সরেজমিনে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকালেই তাঁর কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত হওয়ায় এই সফর পিছিয়ে দুপুরে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় হলো বৈঠকের ব্যাপ্তি। আগের দিন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সার্জিও গোর যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেন, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে তাঁর শুক্রবারের বৈঠকটি তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দীর্ঘায়িত হয়েছিল। কূটনৈতিক প্রশ্ন: ঠিক কোন জরুরি কিংবা কৌশলগত প্রেক্ষাপটের কারণে পূর্বঘোষিত একটি মানবিক কর্মসূচি পিছিয়ে দিয়ে এমন দীর্ঘ আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো? ওয়াশিংটন বা নতুন দিল্লি—কোনো পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। ২. ব্যক্তিমাত্রিক গুরুত্ব ও ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি অক্ষ দীনেশ ত্রিবেদী একাধারে ভারতীয় রাজনীতির ঝানু ব্যক্তিত্ব এবং অভিজ্ঞ কূটনৈতিক রূপকার। ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন ও স্পর্শকাতর সময়ে তাঁর এই দায়িত্বে আসা ইঙ্গিত দেয়—এখানে কেবল প্রথাগত কূটনীতি নয়, রয়েছে গভীর রাজনৈতিক কৌশল। অন্যদিকে, সার্জিও গোর একাধারে ভারতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত এবং পুরো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূত। দায়িত্ব নেওয়ার সময়ই গোর প্রকাশ্যে ত্রিবেদীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন এবং যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। ওয়াশিংটনের বিদ্যমান আঞ্চলিক নীতিতে বাংলাদেশের বিষয়টি বহুলাংশে দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি ও অক্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিচার করার একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। ফলে এই দুই শীর্ষ প্রতিনিধির সরাসরি সাক্ষাৎ দুই দেশের যৌথ কৌশলেরই একটি অংশ।

৩. পর্দার আড়ালের ভূরাজনৈতিক বার্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গোর-ত্রিবেদী বৈঠকের দীর্ঘ সময়সীমা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এতে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সম্ভাব্য রূপরেখা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য। • শক্তি ভারসাম্যের টানাপোড়েন: বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বেইজিং কিংবা আঙ্কারা-মুখী পররাষ্ট্রনীতির সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন ও ভারতীয় মহলে কৌশলগত উদ্বেগের গুঞ্জন রয়েছে। চীন ও তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি ঠেকাতে ওয়াশিংটন ও সাউথ ব্লক যৌথভাবে কীভাবে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সমীকরণ মূল্যায়ন করবে, তা এই আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। • রাজনৈতিক দল ও নতুন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে গুঞ্জন: রাজনৈতিক চত্বরে জোর গুঞ্জন রয়েছে যে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো শক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা, তাদের প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা এবং তাদের মাধ্যমে সম্ভাব্য রাজপথের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে পর্দার আড়ালে নানা আলোচনা চলছে। এমনকি আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে পরবর্তীতে কীভাবে ‘স্ট্যান্ডবাই’ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়—এমন তাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশও এই দীর্ঘ আলোচনার টেবিলে উঠে এসে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে। উল্লেখ্য, সফরসূচির পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘ বৈঠক সরাসরি কোনো রাজনৈতিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে না; তবে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আমেরিকা ও ভারত যৌথ অবস্থান গঠনে অত্যন্ত সক্রিয়। ৪. ভবিষ্যৎ চিত্র: ঢাকার অবস্থান ও ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ ৩০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া মার্কিন বিশেষ দূতের এই ৩ দিনের সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক সুদৃঢ় করা এবং সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তবে দিনশেষে বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এখন দুটি বিষয়ের ওপর নিবন্ধিত: 1. গোর ও ত্রিবেদীর রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে দুই দেশের দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে কী বক্তব্য দেয়। যদিও না দেয়ার সম্ভাবনা বেশী । 2. সফর শেষে মার্কিন বিশেষ দূতের ঢাকা ত্যাগের পর দেওয়া বার্তায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কোন রূপরেখা ফুটে ওঠে। কক্সবাজার সফরের সময়সূচি বদলে দিয়ে এই জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক এটাই প্রমাণ করে—দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট এখন ওয়াশিংটন ও নয়া দিল্লির জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক ইস্যু।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা