শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: একটি আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

লিখেছেন: নীহারিকা রায় প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৬, ৫:৩২ পিএম
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: একটি আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে নতুন করে যেন লুকোচুরি খেলা শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—প্রতিদিন তাঁর বক্তব্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে তাঁর শাস্তি কার্যকর করতে উন্মুখ হয়ে থাকা গোষ্ঠীর বক্তব্য দিন দিন অসংলগ্ন হয়ে পড়ছে। আগে যাঁরা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরাতে মরিয়া ভাব দেখাচ্ছিলেন, তাঁরাই এখন নিজেদের অবস্থান বদল করছেন। মানুষের বাহ্যিক আচরণ এবং শারীরিক ভাষা (Body Language) পর্যবেক্ষণ করে তাঁর ভেতরের মানসিকতা বা চিন্তাভাবনা অনেকাংশেই অনুমান করা যায়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন মানুষের মৌখিক কথার চেয়ে তাঁর শারীরিক অঙ্গভঙ্গি, চোখের ইশারা এবং কণ্ঠস্বরের ওঠানামা মনের আসল অবস্থা প্রকাশে বেশি ভূমিকা রাখে। কিন্তু যেহেতু আমরা সবাই সংশ্লিষ্ট বক্তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের শারীরিক ভাষা পর্যবেক্ষণ করতে পারছি না (বাস্তবে যা প্রায় অসম্ভব), তাই আমাদের তাঁদের মৌখিক বক্তব্য বা সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই অবস্থান বিচারের চেষ্টা করতে হবে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা উদ্বেগ (Stress & Anxiety) মানুষের সিদ্ধান্ত দ্রুত পরিবর্তন করে এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে দেয় না। বাংলাদেশের আইসিটি (ICT)-এর চিফ প্রসিকিউটর দুদিন আগে যা বললেন তার অর্থ দাঁড়ায়—শেখ হাসিনার দেশে ফেরায় কোনো আইনগত সমস্যা নেই। অথচ তার ঠিক একদিন পরেই আবার বললেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা করে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে হবে, হুট করে আসা ঠিক হবে না। এমন পরিস্থিতি আমরা এর আগেও দেখেছি—১৭ মে ১৯৮১ সালে এবং ৭ মে ২০০৭ সালে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে। উল্লিখিত দুই বারই তাঁকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯৮১ সালে অনেকটা জোর করেই দেশে ফেরার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ১৯ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুতেই তিনি দমে যাননি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন বুঝতে পেরেছে যে শেখ হাসিনা ফিরবেনই, তখন তারা নানা আইনি বাহানা শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে প্রত্যর্পণ বা বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে, সেই চুক্তির আওতায় ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে পাঠাতে বাধ্য। আসুন, এই চুক্তির কয়েকটি ধারা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক এবং দেখা যাক কীভাবে তা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সালে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়। পলাতক আসামিদের দ্রুত হস্তান্তরের জন্য এই চুক্তিটি করা হয়েছিল। এখানে প্রশ্ন উঠেছে—শেখ হাসিনা কি আসলেই পলাতক? নাকি ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিমানবাহিনী তাঁকে ভারতে রেখে এসেছে? তাঁর কাছে তখনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল এবং তিনি সেই সময়েও বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন (যদিও পরে ২০২৪ সালের ৮ই আগস্টের পর তা বাতিল করা হয়)। এ কারণেই ভারত শেখ হাসিনাকে তাঁদের দেশে 'অতিথি' মর্যাদায় স্থান দেয়, যা ছিল সে দেশের একটি সর্বদলীয় সিদ্ধান্ত। চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হচ্ছে—দ্বৈত অপরাধ (Dual Criminality)। যে অপরাধের জন্য বন্দিকে চাওয়া হচ্ছে বা হবে, তা অবশ্যই উভয় দেশের আইনেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে বা হবে। সাধারণত, যে অপরাধের শাস্তি কমপক্ষে এক বছর কারাদণ্ড, কেবল সেসব ক্ষেত্রেই এই চুক্তি কার্যকর হয়। এখন কথা হলো, আইসিটি (International Crimes Tribunal) কোর্ট তো ভারতে নেই। তাহলে বাংলাদেশ সরকারকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও তাঁকে শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়াটির বিস্তারিত জানিয়ে ভারতের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি (শেখ হাসিনা) মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন; তবেই এই ধারা কার্যকর করা সম্ভব। চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো আসামিকে হস্তান্তরের পর যদি তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে অনুরোধকারী দেশকে (এক্ষেত্রে বাংলাদেশ) লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে। এই নিশ্চয়তায় উল্লেখ থাকতে হবে যে, আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না, আর যদি দেওয়াও হয় তবে তা কার্যকর করা হবে না (তার পরিবর্তে যাবজ্জীবন বা অন্য কোনো সাজা দেওয়া হবে)। বাংলাদেশ কি ভারতকে এমন কোনো লিখিত নিশ্চয়তা দিয়েছে? তার আগে তো বাংলাদেশকে সাক্ষি সাবুদ দিয়ে ভারতের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে, শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজা পাওয়ার মতো অপরাধ করেছেন। চুক্তিতে অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগও রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যদি অনুরোধকারী দেশ এমন কোনো আইনি নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয় বা অস্বীকার করে, তবে আশ্রয় প্রদানকারী দেশ (এ ক্ষেত্রে ভারত) ওই আসামিকে হস্তান্তর করতে আইনগতভাবে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। আরেকটি বাস্তবসম্মত প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনা এখন ভারতে আছেন ভ্যালিড পাসপোর্ট ছাড়া। তাহলে এখন কী হবে? তাঁকে কি ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে, নাকি হবে না? অভিজ্ঞ মহল বলছেন, ট্রাভেল পাস না দিলেও শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন, কারণ তিনি এই মা ও মাটির সন্তান। বাংলাদেশের আইসিটি-এর চিফ প্রসিকিউটর যে আইনের ওপর ভিত্তি করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত চাচ্ছেন, সেই আইনের জ্ঞান যদি এমন নড়বড়ে হয়, তাহলে তাঁরা শুধু শেখ হাসিনা কেন, গোটা বাংলাদেশকে যে ফাঁসি দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান বানিয়ে দেননি, সেটাই আমাদের সৌভাগ্য! বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী শেখ হাসিনা নাকি বলেছেন: "আমার মাটি আমার মা, মায়ের কাছে ফিরতে আমায়, কেউ ঠেকাতে পারবে না।"

নীহারিকা রায় লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক