শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

ভূ-রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে কাশ্মীর ও ওআইসি: বাংলাদেশের বৈরিতা এবং আত্মঘাতী কূটনীতির মারপ্যাচ

✍ লিখেছেন: মো:দুলাল হোসেন,সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৪:০৬ পিএম
ভূ-রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে কাশ্মীর ও ওআইসি: বাংলাদেশের বৈরিতা এবং আত্মঘাতী কূটনীতির মারপ্যাচ

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসি-র (OIC) প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে নতুন করে কূটনৈতিক চাপ তৈরি করার অপচেষ্টা চলছে। বাগদাদে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে পাকিস্তানের প্ররোচনায় গৃহীত ভারত-বিরোধী প্রস্তাব এবং সেই প্রস্তাবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকারের অন্ধ সমর্থন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বিপজ্জনক মেরুকরণ তৈরি করেছে।

ওআইসি সম্মেলনে কাশ্মীর ইস্যু এবং ভারতের কঠোর অবস্থান

ইরাকের বাগদাদে অনুষ্ঠিত ওআইসি-র ৫৭ সদস্য দেশের বৈঠকে কাশ্মীর ও ভারতের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে লক্ষ্য করে একটি বিতর্কিত প্রস্তাব পাস করানো হয়। এই প্রস্তাবের মূল সুর ছিল জম্মু ও কাশ্মীরকে তথাকথিত 'বিতর্কিত অঞ্চল' হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর দমনপীড়ন ও জনমিতি পরিবর্তনের অভিযোগ আনা।

এর জবাবে ভারত সরকার অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের স্পষ্ট বার্তা হলো—জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও চিরস্থায়ী অঙ্গ এবং এই বাস্তবতায় কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রোপাগান্ডা কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ওআইসি-র এই প্রস্তাবটি মূলত পাকিস্তানি কূটনীতির সংকীর্ণতা এবং পক্ষপাতদুষ্ট প্রোপাগান্ডারই প্রতিফলন।

পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তান কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংঘাত চালিয়ে আসছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে কোণঠাসা হয়ে পড়ার পর পাকিস্তান বারবার ওআইসি-কে তাদের আঞ্চলিক প্রোপাগান্ডা মেশিন বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর ভারতীয় জম্মু ও কাশ্মীরে যে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, পর্যটন খাতের বিকাশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক মহল চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে (POK) সাধারণ বেসামরিক জনগণের ওপর চলা রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি চাপা দিতেই ইসলামাবাদ ওআইসি-র কাঁধে বন্দুক রেখে এই ধরনের চাতুর্যপূর্ণ চাল চালছে।

বাংলাদেশের অবস্থান ও আত্মঘাতী কূটনৈতিক পতন

এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—সৌদি আরব, কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো ওআইসি-র আনুষ্ঠানিক দলিলে স্বাক্ষর করলেও ভারতের সাথে তাদের দ্বিপাক্ষিক (Bilateral) কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে বজায় রেখেছে। কিন্তু ব্যতিক্রমী ও আত্মঘাতী অবস্থান নিয়েছে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার।

আলোচনায় উঠে এসেছে যে, বর্তমান প্রশাসন পাকিস্তানের প্ররোচনায় ওআইসি-র এই ভারত-বিরোধী রেজুলেশনে সায় দিয়ে নিজেদের কূটনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। ভারতের মতো নিকটতম ও সর্ববৃহৎ প্রতিবেশীকে পাশ কাটিয়ে এবং অপ্রয়োজনীয় বৈরিতা তৈরি করে বাংলাদেশ কার্যত এক ধরনের আত্মঘাতী পথ বেছে নিয়েছে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি

ভারতের সঙ্গে এই অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক দূরত্ব এবং অন্ধ ভারত-বিরোধী অবস্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনতে পারে। খাদ্যপণ্য আমদানি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক লেনদেন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ভারতের ওপর যথেষ্ট মাত্রায় নির্ভরশীল।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান সরকার যদি জামায়াত-মৌলবাদী শক্তির প্রভাবে অন্ধ হয়ে ভারতের সঙ্গে বৈরিতা জিইয়ে রাখে, তবে ভারতের যেকোনো কঠোর অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক পদক্ষেপের খেসারত দিতে হবে সাধারণ এ দেশের জনগণকে। এর ফলে আসন্ন দিনগুলোতে দেশে চরম দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক মন্দা এবং বহুমুখী সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওআইসি প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে পাকিস্তানের প্রক্সি হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার এই কূটকৌশল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত নিবিড়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাস্তবসম্মত পররাষ্ট্রনীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে পাকিস্তানীকরণ ও উগ্রবাদী এজেন্ডার দিকে ঝুঁকে পড়া দেশের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।

শেষ কথা:

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং দেশের আপামর জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে এই ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর কূটনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে ফিরে আসাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক: মো:দুলাল হোসেন,সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: