মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের প্রভাব: জ্বালানি সংকটে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পিডিবি

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৪ পিএম
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের প্রভাব: জ্বালানি সংকটে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পিডিবি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘাত এবং তীব্র উত্তেজনার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৬৩ ডলারে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক এই সংঘাতের সরাসরি আঘাত এসে পড়েছে বাংলাদেশের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি খাতে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ায় চরম সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনে কম মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে সংস্থাটি এখন দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে।

রেকর্ড লোকসানের মুখে পিডিবি, বিপিসি ও পেট্রোবাংলা

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পিডিবি আশঙ্কা করছে, এই অর্থবছরে তাদের মোট লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। পিডিবির পাশাপাশি জ্বালানি খাতের অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বেশি দামে তেল কিনে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করার কারণে গত আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান ২২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অপরদিকে, আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকে চড়াদামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে গিয়ে গত ছয় মাসে পেট্রোবাংলার ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। শুধু তেল ও গ্যাস খাতেই মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়, যা চলতি সেপ্টেম্বর মাসে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের বাজার উত্তপ্ত: বাড়ছে উৎপাদন খরচ

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের বিশ্ববাজারও এখন উত্তপ্ত। বাংলাদেশ সাধারণত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা আমদানি করে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি কয়লা উত্তোলন ২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ায় এবং যুদ্ধজনিত কারণে সমুদ্রপথে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতি টন কয়লার দাম ১১০ ডলার থেকে বেড়ে ১৪০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে দেশের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। অপরদিকে, দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও গত জুন মাসে বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু জ্বালানির অতিরিক্ত আমদানিমূল্যের কারণে লোকসান কমানোর সেই চেষ্টা ব্যর্থ হতে চলেছে।

সংকট নিরসনে সরকারি পদক্ষেপ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ

এই বহুমুখী সংকট সামাল দিতে সরকার এবং বিদ্যুৎ বিভাগ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও কঠোর মনিটরিংয়ে সংকট নিরসনে বিভিন্ন বিকল্প পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারণা, বিশ্ব পরিস্থিতি ও যুদ্ধ যদি নতুন করে আর বেগবান না হয়, তবে আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ মতামত: সাশ্রয়ী নীতি ও লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, বিদ্যমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেশজুড়ে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়লেও অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে শিল্পকারখানায় তেল ও এলএনজি সরবরাহ অব্যাহত রাখা জরুরি। তবে সামনের শীত মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় লোডশেডিং খানিকটা বাড়িয়ে জ্বালানি ও অর্থ সাশ্রয় করা যেতে পারে। এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতাও অত্যন্ত প্রয়োজন।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)