সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

সেপ্টেম্বরে কারা হেফাজতে মৃত্যু ২৪, ‘মবে’ নিহত ২৩: বিচারহীনতা ও অন্ধ হিংসার অন্ধকারে আমাদের সমাজ!

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১ অক্টোবর ২০২৬, ৩:০৩ পিএম
সেপ্টেম্বরে কারা হেফাজতে মৃত্যু ২৪, ‘মবে’ নিহত ২৩: বিচারহীনতা ও অন্ধ হিংসার অন্ধকারে আমাদের সমাজ!

জীবনের নিরাপত্তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ: মব সহিংসতা ও বিচারহীনতার নির্মম বাস্তবতা একটি সভ্য সমাজে মানুষের জীবন ও মর্যাদার চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই এক মাসে দেশে 'মব' বা জনরোষের নামে সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৩টি তাজা প্রাণ। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই বেপরোয়া প্রবণতা আজ আমাদের সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। চুরি, ডাকাতি কিংবা সামান্য বাকবিতণ্ডার জেরে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার মতো নিষ্ঠুরতা আমাদের কোন অসভ্যতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে?

কারাগারের অন্ধকূপ আর রক্ষক থেকে ভক্ষক হয়ে ওঠার বেদনা

আইনশৃঙ্খলা ও বিচার নিশ্চিত করার কথা যে প্রতিষ্ঠানের, সেই কারাগার বা হেফজাতেই যদি মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে যায়, তবে মানুষ আশ্রয় খুঁজবে কোথায়? অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, আগস্ট মাসে কারা হেফাজতে যেখানে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেপ্টেম্বর মাসে তা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে! রক্ষণের দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের হেফাজতে এমন ধারাবাহিক মৃত্যু গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে এক নারীর মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনাও আমাদের মানবিক বিবেককে মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে।

অনিশ্চয়তার বেড়াজালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও উপাসনালয়ের পবিত্রতা রক্ষা

সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু—নিরাপত্তা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত অধিকার। কিন্তু সেপ্টেম্বরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের লজ্জা দিয়েছে। এমএসএফের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই এক মাসে অন্তত ১০টি প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে এবং সংঘটিত হয়েছে জাতিগত নির্যাতনের ঘটনা। কুষ্টিয়ার মহাশ্মশানে গরু জবাই করে পিকনিক করার মতো চরম ঔদ্ধত্য এবং পবিত্র চিতা ও সমাধির ওপর জুতো পায়ে ছবি তোলার বিকারগ্রস্ততা আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কেই স্পষ্ট করে তোলে।

সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরা এবং অজ্ঞাত লাশের মিছিল

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকরাও আজ নিরাপদ নন। যদিও শারীরিক হামলা কিছুটা কমেছে, তবে আইনি হয়রানি এবং সাইবার সিকিউরিটি আইনে মামলার জালের মতো বেড়াজাল প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে ২৮ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার এবং ৮টি ডিজিটাল মামলায় বহু মানুষকে হেনস্তা হতে হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার—যার মধ্যে ৫৫ জন পুরুষ ও ১৫ জন নারী—আমাদের বুঝিয়ে দেয়, সমাজে অপরাধের মাত্রা কোন ভয়ংকর জায়গায় পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহত হওয়া এবং পুশইনের চেষ্টা দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের নাম।

অন্ধকারের চাদর সরিয়ে মানবতার আলো জ্বালাতে হবে

সেপ্টেম্বরের এই রক্তাক্ত ও বেদনাবিধূর চিত্র কেবল কিছু পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতার এক করুণ দলিল। মব সন্ত্রাস, কারা হেফাজতে মৃত্যু, প্রতিমা ভাঙচুর আর মানবাধিকারের এই চরম লঙ্ঘন রোধ করা না হলে আমরা একটি সুস্থ জাতি হিসেবে টিকতে পারব না। এখনই সময় দলমত নির্বিশেষে এই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। প্রতিটি মানুষের জীবন মূল্যবান—এই উপলব্ধি ফিরিয়ে এনে একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের আজকের একমাত্র ব্রত।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: