রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

মৃত্যুর পলিমাটিতে ফুটে ওঠা অনন্ত সূর্য: স্মৃতির ক্যানভাসে এক দূরবর্তী নক্ষত্র

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪২ পিএম
মৃত্যুর পলিমাটিতে ফুটে ওঠা অনন্ত সূর্য: স্মৃতির ক্যানভাসে এক দূরবর্তী নক্ষত্র

টুঙ্গিপাড়ার শান্ত মাটি যখন তাঁকে নিজের বুকে আড়াল করে নিয়েছিল, ঘাতকেরা ভেবেছিল—সব শেষ। ভেবেছিল, লাল-সবুজের মানচিত্র থেকে একটি নাম স্রেফ মুছে দিলেই ইতিহাসের গতিপথ বদলে যাবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, কিছু মানুষ মাটির নিচে বিলীন হন না; বরং বীজ হয়ে ফুটে ওঠেন কোটি কোটি হৃদয়ে। নাম মুছে ফেলার অপচেষ্টা, ইতিহাসে খলনায়ক প্রতিস্থাপনের চক্রান্ত কিংবা স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত—কোনো কিছুই সত্যকে পরাজিত করতে পারেনি। সময় প্রমাণ করেছে, শেখ মুজিবুর রহমান কেবল এক ব্যক্তি নন, তিনি স্বয়ং বাংলাদেশ।

পঁচাত্তরের সেই রক্তঝরা দিনে আমার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। জীবনের সম্পূর্ণ সমীকরণ বুঝে ওঠার বয়স সেটি নয়, তবু অবুঝ মনে এটুকু ধরে নিতে পেরেছিলাম যে, এক বিশাল ছায়া আমাদের মাথার ওপর থেকে সরে গেছে। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকমুক্ত, অথচ নীরব-স্তব্ধ এক শূন্য বাংলাদেশে বড় হতে হতে প্রতিদিন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি। অদ্ভুত এক উপলব্ধি আমাকে গ্রাস করেছে—যে বঙ্গবন্ধুকে আমি কোনোদিন স্বচক্ষে দেখিনি, যিনি আমার শৈশবের কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতির অংশ নন, তাঁর অনুপস্থিতিই যেন আমার জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে! জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে এই যে অদৃশ্যে থাকা মহীরুহ, তাঁর আদর্শগত শক্তি আজ আমার কাছে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী, হাজার গুণ বেশি জাগ্রত।

যত দিন যাচ্ছে, তিনি সময়ের পলি সরিয়ে নিজের আপন মহিমায় আরও প্রদীপ্ত হয়ে আমাদের মাঝে ধরা দিচ্ছেন। আমাদের প্রতিদিনের সংগ্রাম, আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া কিংবা স্বাধিকারের শেষ বিন্দুটি আগলে রাখার পেছনে প্রেরণা হয়ে কাজ করছেন তিনি। তাঁর রক্তে ভেজা আত্মত্যাগ আজ প্রতিটি বাঙালির চেতনায় এক অমর দীপ্তি।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের গর্জন—“রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ”—কেবল একটি ঐতিহাসিক ভাষণের পঙ্ক্তি নয়; এটি আজ আমাদের অস্তিত্বের মূলমন্ত্র। তাঁর রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র পাতায় পাতায় যে নিরহংকার, সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসার ছোঁয়া পাওয়া যায়, তা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। তিনি লিখেছিলেন, “একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি... আমার দেশবাসীকে আমি ভালোবাসি।” এই অপরিসীম ভালোবাসাই তাঁকে মৃত্যুর ওপারে নিয়ে গিয়েও অমর করে রেখেছে।

আজ সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে টুঙ্গিপাড়ার সেই সবুজ চত্বরে যান। কবরের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে একটি ফুল রেখে নীরবতা পালন করেন। সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল নিঃশ্বাসের সাথে মিশে থাকা চিরন্তন শ্রদ্ধা। ঘাতকের বুলেট তাঁর স্পন্দন থামিয়ে দিতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু বাঙালির আত্মায় খোদাই করা তাঁর প্রতিচ্ছবিকে মোছাতে পারেনি। তিনি চিরঞ্জীব—আমাদের প্রতিটি ভালো কাজের অনুপ্রেরণায়, আমাদের ভালোবাসায় এবং আমাদের লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকায়।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)