মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

একটি ‘ভিসা কার্ড’ চাই

লিখেছেন: ব্রুনাই প্রবাসী চিকিৎসক প্রকাশিত: ৭ জুলাই ২০২৬, ৭:০১ এএম
একটি ‘ভিসা কার্ড’ চাই

চারদিকে আজকাল নানা ধরনের কার্ডের আলোচনা। কিন্তু সেসব কার্ডের কোনোটিই আমার প্রয়োজন মেটায় না। আমার প্রয়োজন একটিই—একটি ‘ভিসা কার্ড’। অনুগ্রহ করে ভুল বুঝবেন না। আমি কোনো ব্যাংকের ভিসা ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের কথা বলছি না। আমি বলছি এমন এক প্রতীকী ‘ভিসা কার্ড’-এর কথা, যা থাকলে পৃথিবীর যেকোনো দেশে ভিসা পাওয়া সহজ হবে, আর ইমিগ্রেশন ডেস্কে দাঁড়িয়ে একজন বাংলাদেশি হিসেবে অন্তত ন্যূনতম সম্মানটুকু নিশ্চিত হবে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য বিদেশ ভ্রমণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। সবুজ পাসপোর্ট দেখলেই যেন অনেক দেশের চোখে সন্দেহের ছায়া। ভিসা পাওয়া কঠিন, পেলেও মেয়াদ স্বল্প। একসময় যেসব দেশে অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা ছিল, তার বেশিরভাগই এখন অতীত। হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া সেই সুযোগ প্রায় বিলুপ্ত। আমি দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে ব্রুনাইয়ে বসবাস করছি। অথচ আজ সেই ব্রুনাইয়েও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা পাওয়া আগের মতো সহজ নয়। আমার ও সহধর্মিনীর কিছু সুবিধা থাকলেও আমাদের সন্তানদের জন্য পরিস্থিতি বেশ জটিল। ধরা যাক, একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার জহর বাহরুতে পড়াশোনা করছেন। কেবল বাবা-মায়ের সঙ্গে ব্রুনাইয়ে কয়েক দিনের জন্য দেখা করতে চাইলে তার সামনে তিনটি কঠিন পথ খোলা থাকে। প্রথমত, তাকে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে ব্রুনাই হাই কমিশন থেকে ভিসা সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ জহর বাহরু থেকে কুয়ালালামপুর, সেখান থেকে ঢাকা, আবার ঢাকা হয়ে ব্রুনাই—শুধু একটি ভিসার জন্য এত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রা। দ্বিতীয়ত, কুয়ালালামপুরে গিয়ে আবেদন করতে হবে। সেখানে অন্তত তিন কর্মদিবস অবস্থান করতে হয়। একজন শিক্ষার্থীর জন্য অতিরিক্ত থাকা-খাওয়ার খরচ ও সময়—দুটিই বড় বোঝা। তৃতীয় বিকল্প সিঙ্গাপুর। কিন্তু সেখানে প্রবেশ করতেই আবার আলাদা ভিসা প্রয়োজন। শুধু তা-ই নয়, জহর বাহরুতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের অনেক ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের ভিসার জন্য আগে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে সুপারিশপত্রও সংগ্রহ করতে হয়। অর্থাৎ একটি ভিসা পেতে আরেকটি ভিসার পেছনে ছুটতে হয়। অথচ কয়েক বছর আগেও আমাদের সন্তানরা অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে খুব সহজেই ব্রুনাইয়ে এসে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারত। আজ সেই সুযোগ নেই। এই ভোগান্তি শুধু আমার পরিবারের নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজধানীর বাইরে বসবাসকারী অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, একজন বাংলাদেশি হিসেবে কেন আমাদের বারবার এমন জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে? কেন একটি ভিসা পাওয়ার জন্য এত অনিশ্চয়তা, এত ব্যয়, এত হয়রানি? কেন বিদেশের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় নিয়েই অস্বস্তি বোধ করতে হবে? একটি দেশের পাসপোর্ট শুধু ভ্রমণের দলিল নয়; এটি সেই দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং নাগরিকের প্রতি বিশ্বের আস্থার প্রতিফলন। পাসপোর্ট যত শক্তিশালী, নাগরিকের সম্মানও তত বেশি। তাই সরকারের প্রতি বিনীত আহ্বান—বাংলাদেশি পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা বৃদ্ধিকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হোক। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে আরও বেশি দেশের সঙ্গে সহজতর ভিসা ব্যবস্থা, ভিসা-অন-অ্যারাইভাল কিংবা ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। আমরা চাই না বিশ্বের দরজা আমাদের জন্য আলাদা করে খুলে দেওয়া হোক। আমরা শুধু চাই, একজন বাংলাদেশি হিসেবে পৃথিবীর যেকোনো দেশের ইমিগ্রেশন ডেস্কে দাঁড়িয়ে যেন সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বলতে পারি—এই পাসপোর্ট আমার পরিচয়, আর এই পরিচয় কোনো বোঝা নয়। আমার সেই কাঙ্ক্ষিত ‘ভিসা কার্ড’ আসলে কোনো প্লাস্টিকের কার্ড নয়। এটি একটি শক্তিশালী, মর্যাদাবান বাংলাদেশি পাসপোর্টের প্রতীক—যা বহন করলে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমবে, ভ্রমণ হবে সহজ, আর বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে একজন বাংলাদেশি তার প্রাপ্য সম্মানটুকু পাবেন।