বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, শেখ হাসিনার উন্নয়ন: স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলা ও আগামী দিনের প্রত্যাশা
হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে ১৯৭১ সালের আগে বাঙালি জাতি কখনো স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়নি। ১৯৬৬ সালের আগে এমন কোনো একক রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, যিনি সমগ্র বাঙালি জাতিকে একটি অভিন্ন লক্ষ্য ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। আবার ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পূর্বে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তা, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক গৌরবের চেতনা এত ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়নি। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সেই ঐতিহাসিক নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মহান ব্যক্তিত্ব বাঙালির সংস্কৃতি, সাহিত্য ও রাজনৈতিক অধিকারের আকাঙ্ক্ষাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে বাঙালি জাতিকে উপমহাদেশের ইতিহাসে কখনো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতি হিসেবে কল্পনা করা হয়নি, সেই জাতিকে মাত্র ২৬ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বাঙালিকে আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সাহস যুগিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তি এই স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং রাষ্ট্রের মূল আদর্শের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে ইতিহাসে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সামরিক শাসনের দীর্ঘ সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্র ও সমাজে বিভাজন, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তার ঘটে, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। সে সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পাঁচ বছর পূর্ণ মেয়াদ শেষে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং উগ্রবাদী শক্তির উত্থান দেশের অগ্রগতির পথে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। তিনি রূপকল্প ২০২১ এবং পরবর্তীতে রূপকল্প ২০৪১-এর মাধ্যমে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের লক্ষ্য সামনে তুলে ধরেন এবং অর্থনৈতিক মুক্তির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও সেই স্বাধীনতার পূর্ণতা মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে—এই বিশ্বাস থেকেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উন্নয়নকেন্দ্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করে। পরবর্তী বছরগুলোতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায় এবং দেশ উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। এই ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়, দারিদ্র্য হ্রাস পায় এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলেও বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হতে শুরু করে। তবে এই অগ্রযাত্রা সবসময় সহজ ছিল না। রাজনৈতিক বিরোধ, মতাদর্শগত সংঘাত এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ধারাকে বারবার পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। লেখকের মতে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে নানা সময়ে চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন সেই ধারারই একটি অংশ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার চেতনা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে এবং জনগণের একাংশ মনে করছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ সম্ভব। লেখকের মতে, বাংলাদেশের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং নাগরিক মর্যাদা রক্ষা করা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে একটি আধুনিক, উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়াই ছিল শেখ হাসিনা সরকারের লক্ষ্য। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, মানবিক মূল্যবোধ এবং সহনশীল সমাজ গঠনই হবে জাতির ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি। লেখকের বিশ্বাস, এই লক্ষ্য অর্জনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও মনে করেন, ২০২৪ সালের ঘটনাবলিকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে অনুশোচনা তৈরি হয়েছে, তার উত্তরণ সম্ভব মুজিব আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই। তাঁর মতে, এর মাধ্যমেই সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ সুদৃঢ় হবে এবং দেশীয়-বিদেশি ষড়যন্ত্র পরাজিত হবে। জয় বাংলা। লেখক: শচীন বাঙালি