সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে পীরগঞ্জ হাসপাতাল: শয্যাশূন্য মেঝেতে কান্নার রোল, চিকিৎসক ও খাদ্যাভাবে বিপর্যস্ত চিকিৎসাসেবা

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫০ এএম
মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে পীরগঞ্জ হাসপাতাল: শয্যাশূন্য মেঝেতে কান্নার রোল, চিকিৎসক ও খাদ্যাভাবে বিপর্যস্ত চিকিৎসাসেবা

নিঃস্ব মানুষের শেষ ঠিকানায় উপচে পড়া ভিড়

পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গেটে পা রাখলেই কান্নার আওয়াজ, দীর্ঘশ্বাস আর স্বজনদের আহাজারি ভারি করে তোলে চারপাশের বাতাস। ৫০ শয্যার এই নামমাত্র হাসপাতালে এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন ১৩০ জন অসহায় রোগী। তিল ধারণের ঠাঁই নেই কোথাও; হাসপাতালের ওয়ার্ডের মেঝে থেকে শুরু করে স্যাঁতসেঁতে বারান্দা—সবখানেই এখন রোগীদের আর্তনাদ। ডেঙ্গুর ভয়াল থাবায় আক্রান্ত ২৯ জনসহ বিভিন্ন ঋতুভিত্তিক রোগে আক্রান্ত হয়ে এখানে ছটফট করছেন সাধারণ মানুষ। একটু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আকুতি ঝরে পড়ছে প্রতিটি রোগীর চোখে-মুখে, কিন্তু সামর্থ্যহীন এই মানুষগুলোর শেষ আশ্রয়স্থলটিও আজ নিজেই গভীর সংকটে ধুঁকছে।

ঢাকাফেরত মানুষের শরীরে ঘাতক ডেঙ্গুর কোপ

জীবিকার টানে বা পরিবারের টানে ঢাকা থেকে জ্বর নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফেরা মানুষগুলোর বুক জুড়ানোর বদলে কপালে জুটেছে মৃত্যুর পরোয়ানা। পীরগঞ্জে পা রাখার পর রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হওয়ায় মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে গেছে অনেক পরিবারের স্বপ্ন। ১৪ জন পুরুষ ও ১০ জন নারীসহ ২৯ জন ডেঙ্গু রোগী যখন শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের ঠান্ডা মেঝে ও বারান্দায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন, তখন তাদের স্বজনদের বুকফাটা কান্না উপস্থিত যেকোনো মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। ঢাকা থেকে ফেরা ভুক্তভোগী নাহিদ ও চিকিৎসাধীন হালিমা বেগমের মতো শত শত মানুষের আকুতি—‘একটু সুস্থ হওয়ার আশায় বাড়ি ফিরেছিলাম, অথচ আজ এখানে এসে জীবনটাই সংশয়ে পড়ে গেল।’

টিকিট থেকে চিকিৎসাসেবা: চরম ভোগান্তির দীর্ঘ লাইন

বহির্বিভাগের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কষ্টের যেন শেষ নেই। পার্বতীপুর থেকে আসা অসহায় রোগী জাহানারা বেগম দীর্ঘ আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও যখন চিকিৎসকের দেখা পাননি, তখন তার দীর্ঘশ্বাস বলে দেয় আমাদের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার নির্মম চিত্র। সকালের দিকে ঘণ্টাখানেকের জন্য চিকিৎসকদের রাউন্ডে দেখা মিললেও দুপুর গড়ালে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তাদের ছায়াও পাওয়া যায় না। এর ওপর চরম অমানবিক ব্যাপার হলো—ভর্তি রোগীদের জন্য পরিবেশন করা হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার, যা মুখে তোলার জো নেই। চিকিৎসার পাশাপাশি এই অবহেলা ও খাদ্যাসংকট রোগীদের শারীরিক কষ্টের সঙ্গে মানসিক যন্ত্রণা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জনবল সংকটে ধুঁকছে চিকিৎসালয়, বন্ধ জরুরি প্রসূতিসেবা

হাসপাতালটির প্রশাসনিক ও চিকিৎসাসেবার কঙ্কালসার চিত্র ফুটে ওঠে যখন এর ভেতরের অব্যবস্থাপনার খবর সামনে আসে। ২০১১ সালে হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও সে অনুযায়ী এক ফোঁটাও বাড়েনি জনবল। ২৩টি চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কঙ্কালসার অবস্থায় কেবল ৯ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে পুরো উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা। আর ৯৯টি পদের কর্মচারীর শূন্যতা তো পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকেই পঙ্গু করে দিয়েছে। গত আগস্টে একমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও বদলি হয়ে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে জীবনরক্ষাকারী জরুরি প্রসূতিসেবা (ইওসি) ও সিজারিয়ান অপারেশন। ফলে প্রসববেদনায় কাতর অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে ৪৮ কিলোমিটার দূরের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যেতে বাধ্য হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো, যার পথেই অনেক সময় ঘটে যায় মর্মান্তিক অঘটন।

পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর চরম ওষুধসংকটে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা

শুধু পীরগঞ্জ সদর হাসপাতালেই নয়, পুরো উপজেলাজুড়েই চলছে এক হৃদয়বিদারক স্বাস্থ্যবিপর্যয়। ২০২৩ সালে ঘটা করে উদ্বোধন হওয়া মাদারগঞ্জ, খালাশপীর ও চতরা মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো গত তিন বছরেও প্রয়োজনীয় জনবলের মুখ দেখেনি; অযত্ন-অবহেলায় আজ সেগুলো পরিত্যক্ত প্রায় ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। ১৫টি ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক না থাকায় বাধ্য হয়ে পার্শ্ববর্তী সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, বিরামপুর ও ঘোড়াঘাট থেকেও হাজার হাজার অসহায় রোগী এসে ভিড় জমাচ্ছেন এই পীরগঞ্জ হাসপাতালেই।

ঘুরে দাঁড়ানোর আকুতি ও চিকিৎসকদের অসহায় আর্তনাদ

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. তারিকুল ইসলামের কণ্ঠে যেন ফুটে উঠেছে গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসহায়ত্বের চিত্র। তিনি বলেন, ‘বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার পীরগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রভাব সবচেয়ে ভয়ংকর। বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৬-৭ শ রোগীকে সামলাতে গিয়ে আমাদের চিকিৎসকরাও ক্লান্ত। সীমিত জনবল ও ওষুধ সরবরাহ নিয়ে আমরা সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু দ্রুত বরাদ্দ ও জনবল বৃদ্ধি না করলে এই বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

অসহায় এই মানুষগুলোর জীবন বাঁচাতে এবং পীরগঞ্জ হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এখন সরকারি ও বেসরকারিভাবে জরুরি হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: