ডিসেম্বর ইস্যু ও দিল্লিতে র-প্রধানের গোপন মিশন: শেখ হাসিনার ফেরা নিয়ে ঢাকা-দিল্লি পর্দার পেছনের কূটনীতি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন দিন দিন প্রবল হচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার ঘোষিত ‘ডিসেম্বর’ সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক পাড়ায় তা নিয়ে কৌতূহল ও নানা হিসাব-নিকাশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর নেপথ্যে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—শেখ হাসিনার ফেরা কি কেবল তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো গোপন সমঝোতা?
ঢাকায় ভারতের গোয়েন্দা প্রধানের সফর ও দিল্লির তিন বার্তা
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, অন্তরালে ভারত ও বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এ বিষয়ে একাধিক অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি ভারতীয় পত্রিকা ‘দৈনিক আনন্দবাজার’ দাবি করেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসন ইস্যুতে দিল্লি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
বাংলাদেশি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর সেক্রেটারি পরাগ জৈনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় ঝটিকা সফর করে। এই দলে ছিলেন অশ্বিন মুকুন্দ, কুটনিজ রাহুল নেগী এবং শৈবাল রায় চৌধুরী। এই সফরের পরপরই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠকে মিলিত হন।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোয়েন্দা দলটির মাধ্যমে দিল্লি মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট শর্ত বা বার্তা ঢাকার কাছে স্পষ্ট করেছে:
সম্মানজনক আচরণ: শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তাঁর সাথে কোনো ধরনের অসম্মানজনক বা অপমানজনক আচরণ করা যাবে না। বিশেষ নিরাপত্তা: আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁর জন্য সর্বোচ্চ স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা সুবিধা: তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে এবং এতে কোনো গাফিলতি বরদাশত করা হবে না। এছাড়া, বাংলাদেশ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চাওয়ার (প্রত্যর্পণ) বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে—প্রত্যর্পণ নয়, শেখ হাসিনা নিজ ইচ্ছাতেই দেশে ফিরবেন।
তারেক রহমানের দিল্লি সফর ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি
শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন ও দেশে ফেরার সময়সীমা ঘোষণা করা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতে পুনরায় কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার হয়েছে। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ ও পরিবেশ মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বৈঠক শেষে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথাসময়ে ভারত সফরে যাবেন। উভয় পক্ষ প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও, এই সফর ও আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে ‘শেখ হাসিনা ইস্যু’ বিদ্যমান বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দলীয় নেতৃত্ব ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতির চর্চা: কী বলছে আওয়ামী লীগ?
শেখ হাসিনার অবর্তমানে দল পরিচালনা এবং সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সংকট নিয়ে জোর চর্চা চলছে। অতি সম্প্রতি 'টি-ওয়াল' নামক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে শেখ হাসিনার একটি অডিও সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।
শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে 'রিফর্মড' আওয়ামী লীগের গুঞ্জন শেখ হাসিনাকে মাইনাস করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার গুঞ্জন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা নিজেই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। ‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলে এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত কেবল দলের কাউন্সিলেই হতে পারে। আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা দাবি করছেন, শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে দল পুনর্গঠন বা 'রিফর্মড আওয়ামী লীগ' করার একাধিক চেষ্টা আগে করা হলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, সভাপতিকে কেন্দ্র করে যে চর্চা চলছে তা মূল আলোচনাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র।
হাইকোর্টে প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ: আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের আইনি জলঘোলা
শেখ হাসিনার ফেরার আলোচনার মাঝেই আরেকটি নতুন আইনি মোড় দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে।
মোহাম্মদ আল আমিন নামের এক ব্যক্তির করা এই রিটে ২০২৫ সালের প্রজ্ঞাপনটিকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা নিয়ে রুল চাওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ও আইনি বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন রিট আদালতে শুনানি তালিকায় আসা নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশেরই ইঙ্গিত বহন করে।
ডিসেম্বর যত কাছে আসছে, শেখ হাসিনার ফেরা কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিয় রাজনীতি ততটাই নাটকীয় রূপ নিচ্ছে। ভারতের নিরাপত্তা বার্তা, সরকারের অবস্থান এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্ধারণ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চালের ওপর।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
মহাকাশ থেকে ছায়াযুদ্ধ: মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার নেপথ্যে কি তবে চিনা কৃত্রিম উপগ্রহ? মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে মহাকাশ গোয়েন্দাগিরির নতুন সমীকরণ
বাংলাদেশ কি চরম সংকটের দ্বারপ্রান্তে? — প্রবৃদ্ধি, শাসনব্যবস্থা ও টিকে থাকা
আগুনের বৃত্তে বাঁধা পৃথিবী: ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে পারস্যের বিষণ্ণ সন্ধ্যা