শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

স্বপ্নে বাংলাদেশ: প্রগতির পথে ফিরে যাওয়ার আহ্বান

লিখেছেন: শচীন বাঙালি প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১:৩৮ পিএম
 স্বপ্নে বাংলাদেশ: প্রগতির পথে ফিরে যাওয়ার আহ্বান

সুফিয়া কামাল বলেছিলেন—“আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা, তোমরা সেই যুগে লেখাপড়া করো মেলা।”

সত্তরের দশকে মানুষ স্বপ্ন দেখত—বাংলাদেশ হবে একটি প্রগতিশীল, মানবিক ও কল্যাণরাষ্ট্র। আমাদের পূর্বপুরুষরা কল্পনা করেছিলেন এমন একটি দেশ, যেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে; গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না; নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না; বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং মানবিক মূল্যবোধ হবে জাতির অগ্রগতির মূল ভিত্তি।

তাদের স্বপ্ন ছিল এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা মানুষকে বিশ্বমানের জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, চারুকলা, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দেবে। এমন একটি প্রগতিশীল বাঙালি জাতি, যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও অবদানে গর্ব অনুভব করবে।

আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরে প্রশ্ন জাগে—সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ কি আমরা গড়তে পেরেছি?

অনেকের মতে, আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রগতির পরিবর্তে সমাজে ধর্মের অপব্যাখ্যা, অসহিষ্ণুতা ও নারীবিদ্বেষের মতো প্রবণতা বাড়ছে। তাঁদের মতে, ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার, নারীর অধিকার সংকুচিত করার প্রচেষ্টা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মৌলিক অধিকারের প্রতি অবহেলা—এসব প্রবণতা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

সমালোচকদের দাবি, যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে, তারা প্রায়ই নারীর স্বাধীনতা, সমঅধিকার ও আধুনিক সমাজব্যবস্থার বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, সমাজের একাংশের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত শ্রেণি, গণমাধ্যম ও প্রগতিশীল শক্তিরও এ বিষয়ে যথেষ্ট সোচ্চার ভূমিকা দেখা যায় না।

তাঁদের প্রশ্ন—যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলেন, তারা আজ কোথায়? যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার আদর্শ এবং প্রগতিশীল সমাজ গঠনের কথা বলেন, তারা কেন নীরব?

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চলছে, যা আধুনিক, মানবিক ও বৈজ্ঞানিক সমাজব্যবস্থার পরিবর্তে মধ্যযুগীয় মানসিকতার দিকে ফিরে যাবে। তাঁদের আশঙ্কা, এতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সাংস্কৃতিক বিকাশ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাঁরা মনে করিয়ে দেন, এই দেশ ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, ভাষাসৈনিকদের সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সেই ত্যাগ ও আদর্শকে স্মরণ রাখা জরুরি।

তাঁদের আহ্বান—বাংলাদেশকে আবারও প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার পথে এগিয়ে নিতে হবে। এই সংগ্রাম ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্য নয়; এটি সাংস্কৃতিক মুক্তি, মানবিক মর্যাদা, নারী-পুরুষের সমঅধিকার, জ্ঞানচর্চা এবং একটি আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। মানবিকতা, গণতন্ত্র, শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করি। সেটাই হোক আমাদের ভবিষ্যতের পথচলা।

লেখক : শচীন বাঙালি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক