সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

আকাশযুদ্ধের নতুন রূপ: মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদী কমান্ডারের বাড়িতে ড্রোন হামলা ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা কৌশল ।

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৪ অক্টোবর ২০২৬, ২:৪৫ পিএম
আকাশযুদ্ধের নতুন রূপ: মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদী কমান্ডারের বাড়িতে ড্রোন হামলা ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা কৌশল ।

১. সীমান্ত পেরিয়ে আকাশপথের বার্তা: মিয়ানমারের সাগাইংয়ে রহস্যজনক ড্রোন হামলা

মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের লাংখো গ্রামে নিষিদ্ধঘোষিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এনএসসিএন-কে (ওয়াইএ)-এর কমান্ডার আখাম কোনিয়াকের বাড়িতে সংঘটিত ড্রোন হামলাটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে। ৩ অক্টোবর ভোরে ঘটে যাওয়া এই হামলায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার বিষয়টি স্পষ্ট হলেও এর নেপথ্য চালিকাশক্তি নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। যদিও কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দায় স্বীকার করেনি, তবুও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি এবং সামরিক কৌশলের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

২. অরুণাচলপ্রদেশের রক্তক্ষয়ী হামলা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

এই ড্রোন হামলার ঠিক কদিন আগেই, অর্থাৎ ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতের অরুণাচল প্রদেশের চাংলাং জেলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২১ আসাম রাইফেলসের টহলদলের ওপর এক অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে এক ভারতীয় জওয়ান নিহত এবং চারজন আহত হন। পরবর্তী সময়ে এনএসসিএন-কে (ওয়াইএ) এবং রেভল্যুশনারি পিপলস ফ্রন্ট (আরপিএফ) যৌথভাবে ওই হামলার দায় স্বীকার করে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় জওয়ানদের ওপর এই হামলার তীব্র জবাব বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এই নিখুঁত ড্রোন হামলা পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে।

৩. গোয়েন্দা কূটনীতি ও ‘অফিশিয়াল সাইলেন্স’-এর নেপথ্য সমীকরণ

মিয়ানমার বা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এই ড্রোন হামলার পেছনে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কথা মাথায় রেখে ঘটনাটিকে আপাতত ‘রিপোর্টেড ড্রোন হামলা’ হিসেবেই রাখা হয়েছে। তবে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দমনে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান বা ক্রস-বর্ডার স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করে আসছে। এই নীরবতা প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে গোয়েন্দা কার্যক্রম ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল আরও অনেক বেশি আগ্রাসী ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে।

৪. বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও আঞ্চলিক সংঘাতের মানবিক মূল্য

যেকোনো সামরিক বা ড্রোন হামলার মতো এই ঘটনায়ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, হামলায় এনএসসিএন-কে (ওয়াইএ)-এর কিছু সদস্যের হতাহত হওয়ার পাশাপাশি দুই বেসামরিক নাগরিক (যার মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে) আহত হয়েছেন। যদিও এই তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও সাগাইং অঞ্চলের মতো রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও গৃহযুদ্ধপীত্তীর্ণ এলাকায় এ ধরনের ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার স্থানীয় সাধারণ জনগণের জীবনকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

৫. উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদ ও ভারতের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি

এনএসসিএন-কে (ওয়াইএ)-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের দুর্গম সীমান্ত এলাকাকে নিরাপদ ঘাঁটি (সেফ হ্যাভেন) হিসেবে ব্যবহার করে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তৎপরতা চালিয়ে আসছে। ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে সীমান্ত পারের এসব গোপন আস্তানায় আঘাত হানার প্রবণতা বেড়েছে। এই ঘটনাটি কেবল একটি একক হামলা নয়, বরং ভারতীয় সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সুরক্ষায় যে কোনো মূল্যে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা বহন করে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: মিয়ানমারের ভেতরে এই ড্রোন হামলা প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সংকটে প্রথাগত সামরিক অভিযানের পাশাপাশি এখন ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এক নতুন অপ্রতিরোধ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ভবিষ্যতে আন্তঃসীমান্ত কূটনীতির গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: