মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

বাংলাদেশে ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, বললেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।

লিখেছেন: সাক্ষাৎকার: শেখ হাসিনা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা। বাংলা কারেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক প্রকাশিত: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩:৫৪ পিএম
বাংলাদেশে ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, বললেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।

একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, ভারতের নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, বলেছেন হাসিনা।

ভারতের গণমাধ্যমে দেয়া প্রথম টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের সাথে তাঁর প্রত্যর্পণকে যুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন যে তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নিজ উদ্যোগে দেশে ফেরার ইচ্ছা পোষণ করছেন। একটি অপ্রকাশিত স্থান থেকে হিন্দুস্তান টাইমসকে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে হাসিনা বিএনপি সরকারের চীন থেকে ২.৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন, এমন এক সময়ে যখন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি, সারের অভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকটে জর্জরিত।

টেলিফোন সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ:

বাংলাদেশ সরকার বলছে, ৫ আগস্ট ভারতীয় মাটি থেকে আপনার সংবাদ সম্মেলন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে এবং ঢাকা এই সফরের শর্ত হিসেবে আপনার প্রত্যর্পণ নির্ধারণ করেছে। এই ঘটনাবলির ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

আমি একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে সংবাদ সম্মেলন করেছি। এটি দুটি দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে সমস্যা হতে পারে? ২০০৭ সালে যখন তারেক রহমান [বাংলাদেশ ছেড়ে] ব্রিটেনে যান, তখন তিনি স্ট্যাম্প পেপারে সই করে মুচলেকা দিয়েছিলেন যে তিনি রাজনীতি করবেন না। তিনি লন্ডন থেকে রাজনীতি করেছেন এবং তাঁর মায়ের [খালেদা জিয়া] স্থলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জনসভা ও দলীয় সভায় অংশ নিয়েছেন। আমি কি কখনো ব্রিটিশ সরকার বলা বন্ধ করতে বলেছি যে আমার দেশের একজন পলাতক আসামি যেন এই ধরনের সভা করতে না পারে? আমি তো কখনো এমন অভিযোগ করিনি। তাঁর সমস্যা কী?

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন-পীড়ন চালানো হচ্ছে, তাঁদের ঘরবাড়িতে হামলা চালানো হচ্ছে—তা শুরু করেছিলেন [অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান] মুহাম্মদ ইউনুস এবং তা অব্যাহত রয়েছে [বিএনপির দ্বারা]। মানুষ খুন হওয়া ছাড়া একদিনও যায় না। রংপুরের ঘটনাটাই ধরুন, যেখানে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে, আর বগুড়া শহরে যেভাবে আমাদের যুব সংগঠনের এক সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। দিনরাত তারা আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করছে, গ্রেপ্তার করছে বা মামলা দিচ্ছে। তারা ঘরে ঢুকে নারী-পুরুষকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছে, প্রবীণদের মারধর ও হেনস্থা করছে। এই পরিস্থিতিতে আমার প্রত্যর্পণ কীভাবে কোনো শর্ত হতে পারে, তা আমি বুঝতে পারছি না। আমি আমার নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছি, তিনি [তারেক রহমান] কেন এতে আপত্তি করছেন তা আমার মাথায় আসছে না। তারা প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা বলছে, অথচ আমি নিজের চেষ্টায় দেশে ফিরে যেতে চাই। আমি ফিরে যাবই। আমি কি সারাজীবন বিদেশে থাকতে পারি? আমাকে আমার দেশে, আমার নিজের মানুষের কাছে ফিরতেই হবে।

সত্যের দ্বারা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিনষ্ট হয় না। এই সম্পর্ক বিনষ্ট হয় তখন, যখন গণতন্ত্র ধ্বংস হয়, চরমপন্থাকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ দেয়া হয়, সংখ্যালঘুরা নিজেদের অনিরাপদ মনে করে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, ভারতের নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি কি আপনার ফেরার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা চূড়ান্ত করেছেন? আপনি কি স্বঘোষিত নির্বাসনে থাকা অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে ফেরার পরিকল্পনা করছেন? আপনার সংবাদ সম্মেলনে আপনি কেন বলেছিলেন যে ফিরে এলে আপনাকে হত্যা করা হতে পারে বা গ্রেপ্তার করা হতে পারে?

আমি বলেছি যে আমি ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার ইচ্ছা রাখছি, কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে দেয়া যায় না। উপযুক্ত সময়ে আমি নির্দিষ্ট তারিখ, সময় এবং প্রবেশের পথ ঘোষণা করব।

আমি ফিরতে চাই কারণ বাংলাদেশকে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। আমাদের সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২,৭৮৪ ডলারে পৌঁছেছিল। সেই অগ্রগতি এখন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ আমলের ৬.৮০% জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন কমে ২.২২%-এ নেমে এসেছে। ৫৪ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। দারিদ্র্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে। নতুন করে দুই কোটিরও বেশি মানুষ বেকার হয়েছে, এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট পুনরায় ফিরে এসেছে।

এটি কেবল আওয়ামী লীগের কোনো ইস্যু নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। উন্নয়ন থমকে গেলে চাকরি বা কর্মসংস্থান হারিয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে মানুষ তাদের নিরাপত্তা হারায়। যখন চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলো পুনরায় জায়গা তৈরি করে নেয়, তখন বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দেশের বাইরে আছেন, অনেকে বাংলাদেশের ভেতরেই আছেন তবে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কে কখন ফিরবেন তা দলীয় আলোচনা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আমি চাই না কোনো নেতা, কর্মী বা সমর্থক অপ্রয়োজনীয় বিপদের মুখে পড়ুক।

আমার বিরুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমার জীবনের ওপর হুমকি নতুন কিছু নয়। ১৯৭৫ সালে আমি আমার পরিবারকে হারিয়েছি। বাংলাদেশে ফিরে আসার পর আমি সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্র এবং বারবার প্রাণনাশের চেষ্টার সম্মুখীন হয়েছি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আমার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। ২৪ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছিলেন। আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমার অনেক সহকর্মী তা পারেননি। সেই হামলাও তখন আমাকে থামাতে পারেনি, আর আজ কোনো হুমকি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেবে না।

আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নই। আমার ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়। এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়।

আপনি কি দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তুতি শুরু করেছেন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যা ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি দেশের জন্য কাজ করেছে। আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশকে স্বাধীন করার জন্য এই দলটিকে পরিচালনা করেছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে এবং সাধারণ দরিদ্র মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী শ্রেণী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানুষের জন্য আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। আমরা বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করার দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিলাম। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ শক্তিশালী অর্থনীতির তালিকায় ৩৫তম স্থানে ছিল এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরেই আমাদের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। আজ তারা সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে গড়ে উঠেছে; অসাংবিধানিক বা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের হাতে এটি গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে সামরিক একনায়করা ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল জারি করেছে, রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, আর মুহাম্মদ ইউনুসও একটি অসাংবিধানিক সরকার গঠন করে একটি দল তৈরি করেছেন।

তারা কেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করল? আওয়ামী লীগ যদি অনেক খারাপ কাজ করে থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষকেই ঠিক করতে দিন। আমরা ভালো নাকি খারাপ, তা নিয়ে আমরা নির্বাচনে জনগণের কাছে যাব এবং তারাই রায় দেবে। আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, জনগণ আমাদের প্রত্যাখান করবে। যারা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, আমাদের দলকে নিষিদ্ধ করার কী অধিকার তাদের আছে?

তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অজস্র নেতা-কর্মী আদালতের চক্করে বাঁধা পড়ে আছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ৬ লাখ মামলা দেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধে কি কারও কথা বলা উচিত নয়? ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে যারা অগ্নিসংযোগ, হামলা ও হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠেছিল, যারা পুলিশ সদস্য এবং দিপু দাসের মতো মানুষকে হত্যা করেছিল—তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে না। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীরা এখন অবাধ সুযোগ পাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগ আছে এবং থাকবে। তারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে পারে বা অন্য যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে এর প্রতি জনগণের সমর্থন এবং প্রতিষ্ঠানটি থেকে যাবে। আমি নিয়মিত আমাদের নেতা-কর্মীদের সাথে কথা বলি এবং তাঁদের সাথে যোগাযোগ রাখি, যদিও তাঁদের মধ্যে ১ কোটি মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়া এবং ২ কোটি মানুষ এখন আর নিজেদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না। আওয়ামী লীগের সদস্যদের ওপর এত অত্যাচারের পরও যদি জনসাধারণের কাছে কোনো দল এখনও জনপ্রিয় থেকে থাকে, তবে তা আওয়ামী লীগ; মানুষের এখনো এই দলের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে।

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আপনি কি ভারত সরকার বা ঢাকা সরকারের সাথে কোনো পরামর্শ করেছেন?

ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমার নিজের, এবং এটি আমার দলের ভেতরের রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়। ঢাকা সরকারের সাথে আমার কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা নেই। যারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে এবং আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দিয়েছে, তারা কোনো গোপন সমঝোতার অংশীদার হতে পারে না।

কিছু প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির চাপের কারণে বিএনপি সরকার আপনাকে প্রত্যর্পণের জন্য চাপ দিচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

আমার বদলে এই প্রশ্নটি আপনার বিএনপি বা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে করা উচিত, আমি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমি কেবল এটুকুই বলতে পারি যে জামায়াত এবং বিএনপি সর্বদাই একসাথে ছিল, অতীতেও তারা একসাথে নির্বাচন করেছে। প্রকৃত অর্থে, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দ্বিতীয়ত, মুহাম্মদ ইউনুস তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন এবং এই তিনটি গোষ্ঠী একই রূপ। এই গোষ্ঠীগুলোর ভেতরে কী চলছে তা আমি জানি না, তবে আমরা সবসময় মনে করি প্রতিবেশী দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিত। আমি যখন ক্ষমতায় ছিলাম, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি যা আমার বাবা দিয়ে গিয়েছিলেন—তাহলো 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়'। আমার শাসনামলে সব দেশের সাথেই বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা প্রতিটি দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছিলাম এবং আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আধুনিক বিজ্ঞান, কম্পিউটার ও প্রযুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে তারা আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে। আমি জানতাম যে বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব না দিলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে শিল্পায়ন হবে না। আমাদের অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক, কিন্তু আমি শিল্পায়নও চেয়েছিলাম।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে আপনার শেষ বৈঠকে তিস্তা নদীর উন্নয়নে ভারতের সাথে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমরা এখন দেখছি বিএনপি সরকার এই প্রকল্পে চীনের সাথে কাজ করছে এবং এটি ভারতীয় পক্ষে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ চীনের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে এবং ২.৩ বিলিয়ন ডলারে চীনা J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার চিন্তাভাবনা কী?

আমি শুধু এটাই বলতে পারি যে আমি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ২৯,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করেছিলাম এবং প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলাম। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কিনতে হয়, কিন্তু বাংলাদেশের কাছে এর জন্য কোনো টাকা নেই। মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে আমাদের ছয়টি সার কারখানার মধ্যে পাঁচটি বন্ধ। তারা সার সরবরাহ করতে পারছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। আমাদের মতো তাদের কোনো বিশাল সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি নেই। তারা ভ্যাকসিন কেনেনি এবং হামে হাজার হাজার শিশু মারা গেছে, তারা শিল্পের জন্য চলতি মূলধন যোগাতে পারছে না।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান কেনার মতো বিলাসী মনোভাব কেন? এটি আমারও প্রশ্ন। তবে এটি আপনার বিএনপি সরকারকেও জিজ্ঞাসা করা উচিত।

তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে, এই বিষয়ে ভারত যেন সহযোগিতা করে সে ব্যাপারে আমরা ভারতীয় পক্ষের সাথে কথা বলেছিলাম। তাদের সরকার যা করছে সে বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।

আপনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশকে "আরেকটি পাকিস্তান" হয়ে ওঠার বিষয়ে এবং বিভিন্ন চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড থেকে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন। আপনি কি এই বিষয়ে আরও কিছুটা বিস্তারিত বলবেন?

জয় যা বলেছে তা কোনো আবেগীয় বক্তব্য ছিল না। বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে এটি ছিল একটি গুরুতর সতর্কতা। "আরেকটি পাকিস্তান" বলতে কোনো দেশের সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়নি। এটি চরমপন্থা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এক ভয়াবহ মেলবন্ধনকে নির্দেশ করে। বাংলাদেশকে সেই দিকেই ঠেলে দেয়া হচ্ছে, যা কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং মেকানিজম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়দা (AQIS) সন্ত্রাসী সেল প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। স্থানীয় তদন্তগুলোও একই বিপদের দিকে ইঙ্গিত করছে। সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্টে কেরানীগঞ্জ থেকে সাভার পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ঘটা ঘটনার সংযোগ একই চরমপন্থী নেটওয়ার্কের সাথে পাওয়া গেছে, যার মধ্যে প্রেশার-কুকার বোমা, পাইপ বোমা, গ্রেনেড, বিস্ফোরক দ্রব্য, অস্ত্র এবং নব্য-জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (Neo-JMB)-এর সম্পৃক্ততা রয়েছে। যখন আন্তর্জাতিক সতর্কতা এবং দেশীয় তদন্ত একই দিকে নির্দেশ করে, তখন কোনো দায়িত্বশীল সরকার এই হুমকিকে অস্বীকার করতে পারে না।

ধর্মীয় উগ্র সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। দেশজুড়ে মাজার, দরগাহ, ভাস্কর্য, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রতীকগুলোর ওপর হামলা চালানো হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়া হচ্ছে। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) এবং অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট (ATU)-এর মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো বিলুপ্ত করার আলোচনা চলছে। যখন জঙ্গিদের মুক্তি দেয়া হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তাদের হেনস্থা করা হয়, তার ফলে জাতীয় নিরাপত্তায় একটি বড় শূন্যতার সৃষ্টি হয়।

যদি চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলো বাংলাদেশে পুনরায় নিরাপদ আশ্রয় পায়, তবে এর প্রভাব ভারত, মিয়ানমার, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্য, অভিবাসন, সামুদ্রিক পথ, কূটনৈতিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সহযোগিতার ওপর গিয়ে পড়বে। তাই জয়ের সতর্কবার্তাকে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে না দেখে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সতর্কতা হিসেবে দেখা উচিত।

ভারতে আপনার সময় কীভাবে কাটছে? বাংলাদেশের কোন বিষয়টি আপনি সবচেয়ে বেশি মিস করছেন?

যেকোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য নিজের মানুষের থেকে দূরে থাকা সবচেয়ে কঠিন কাজ। নির্বাসিত জীবন আমার জীবনে নতুন নয়, তবে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাটা কখনো সহজ হয়ে ওঠে না। আমি ভারতে মর্যাদা ও সম্মানের সাথে অবস্থান করছি, আর সেজন্য আমি ভারত সরকার ও ভারতের জনগণের কাছে কৃতজ্ঞ। তবে আমার মন পড়ে আছে বাংলাদেশে।

আমি প্রতিদিন বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করি। আমাদের নেতা-কর্মী, নির্যাতিত পরিবারগুলো, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং তরুণদের হতাশার কথা আমি প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করি।

যা আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি তা হলো বাংলাদেশের মানুষ—তাঁদের মুখচ্ছবি, ভাষা, সরল বিশ্বাস এবং রূপসী বাংলার মাটি। আমি সেই বাংলাদেশকে মিস করি যা ভয়ের মধ্যে নয়, বরং আশার আলো নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

সাক্ষাৎকার: শেখ হাসিনা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা। বাংলা কারেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক