শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

আন্দোলনে ছিলেন না, তবু ‘জুলাই শহীদ’: গেজেটে নাম ঢোকার নেপথ্যে কারা? প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই চার পুলিশ কর্মকর্তা অব্যাহতি কেন?

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬, ৫:১৫ পিএম
আন্দোলনে ছিলেন না, তবু ‘জুলাই শহীদ’: গেজেটে নাম ঢোকার নেপথ্যে কারা? প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই চার পুলিশ কর্মকর্তা অব্যাহতি কেন?

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকা কিছু ব্যক্তিও কীভাবে সরকারি গেজেটে শহীদের মর্যাদা পেলেন, সেই প্রক্রিয়ায় তৎকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও তাঁর সংশ্লিষ্ট দলের ভূমিকা ছিল। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের বাদ দিয়ে অন্য নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে দুই দফায় ৮৪৪ জনের নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত কয়েকজনের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে এখন গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য ও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, নাটোর, লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁওয়ে ৫ আগস্টের সহিংসতার সময় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বাড়ি ও স্থাপনায় হামলা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েকজন ব্যক্তি আগুনে পুড়ে মারা যান। অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে নিহত হননি; বরং হামলা ও লুটপাটের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং আগুনে আটকা পড়ে প্রাণ হারান। এরপরও তাদের নাম ‘জুলাই শহীদ’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। নাটোরের ঘটনায় পাঁচজন, লালমনিরহাটে ছয়জন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে চারজনের নাম গেজেটে থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে বাড়ির মালিক ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার সময় সংশ্লিষ্ট বাড়িগুলোর মালিকরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—যে ব্যক্তিরা হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেই কীভাবে পরবর্তীতে অপহরণ বা হত্যার অভিযোগ আনা হলো? এই ঘটনাগুলো জুলাই শহীদ গেজেট তৈরির প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষ করে, নিহতদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল, প্রত্যেক ব্যক্তির রাজনৈতিক বা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয় এবং প্রত্যক্ষদর্শী, ময়নাতদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো জনসমক্ষে নেই। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৫ আগস্টের সহিংসতার সময় নিহত পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দীর্ঘদিন জনসমক্ষে না আসায় ঘটনাগুলোর সামগ্রিক চিত্র নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি জনমনে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। ফলে রাজনৈতিক আবেগের বাইরে গিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ যাচাই প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি এসেছে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা ঘিরে। দাবি করা হচ্ছে, উল্লিখিত তিনটি ঘটনার তদন্তে যুক্ত কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে উঠে আসা কিছু তথ্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হওয়ায় তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি এবং তদন্তকারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে এসব দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন। পুরো ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—‘জুলাই শহীদ’ স্বীকৃতি কি কেবল একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি প্রতিটি মৃত্যুর পেছনের বাস্তবতা যাচাই করে দেওয়া একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে তালিকাভুক্ত প্রতিটি মৃত্যুর কারণ, স্থান, সময় এবং প্রেক্ষাপট নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারণ ভুলভাবে কাউকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া যেমন প্রকৃত শহীদদের প্রতি অবিচার, তেমনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো মৃত্যুকে ব্যবহার করা হলে তা ভবিষ্যতের ইতিহাসকেও বিভ্রান্ত করতে পারে।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা