বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

৫ আগস্ট: ইতিহাসের আয়নায় একটি জাতির ২য় মীরজাফরের অধ্যায়

লিখেছেন: শচীন বাঙালি প্রকাশিত: ৬ আগস্ট ২০২৬, ৯:৪৬ এএম
৫ আগস্ট: ইতিহাসের আয়নায় একটি জাতির ২য় মীরজাফরের অধ্যায়

কিছু তারিখ ক্যালেন্ডারের সাধারণ সংখ্যা নয়; তারা একটি জাতির পরাজয়ের পুনরাবৃত্তি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু দিন রয়েছে, যেগুলো আমাদের শুধু অতীতকে স্মরণ করায় না—বারবার একইভাবে আমাদের জাতিকে কখনও পরাধীনতায়, আবার কখনও জাতীয় প্রগতিকে আঘাত করে পিছিয়ে দেয়।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ ছিল বাংলার স্বাধীনতার পতনের সূচনা। সেই পরাজয়ের মূল চরিত্র ছিলেন মীর জাফর, যিনি ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার আত্মীয় ও প্রধান সেনাপতি। ইতিহাস আমাদের শেখায়, কোনো জাতি তখনই সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন তার অভ্যন্তরে বিভক্তি সৃষ্টি হয় এবং জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়। তাই মীর জাফরের নাম শুধু একজন মানুষের পরিচয় নয়; এটি ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার একটি প্রতীক হয়ে আছে। আর মীরজাফরের এই বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য দিয়েছে পুরো ভারতবর্ষ—২৫০ বছরের ইংরেজ শাসনের মাধ্যমে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক গভীর জাতীয় ট্র্যাজেডি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার সেই ঘটনা আজও জাতির বিবেককে নাড়া দেয়। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন মীরজাফরের মতোই তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী খন্দকার মোশতাক এবং যাদের বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করেছিলেন। আর এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ২০ বছরের সামরিক শাসনের সূচনা হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে; ঘুষ, দুর্নীতি, রাহাজানি, মদ, জুয়া, মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত এবং বিচারের নামে প্রহসনসহ একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের কাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

আর এই সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনকালে দেশ যখন উন্নয়ন ও প্রগতির স্পন্দনে এগিয়ে যাচ্ছিল, যখন বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর সকল শ্রেণির মানুষের কাছে বিনিয়োগের অন্যতম স্থান হয়ে উঠেছিল, মানুষ যখন দারিদ্র্যকে পরাজিত করে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখছিল, যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ সকল মৌলিক অধিকার নাগরিকদের জন্য নিশ্চিত হচ্ছিল, তখন আবার একজন মীরজাফরের পুনরায় আবির্ভাব ঘটে। সেই মীরজাফর শেখ হাসিনার আত্মীয় সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান; যার নেতৃত্বে আবার ৫ আগস্ট ইতিহাসে বেইমানির পুনরাবৃত্তি হয়। যার নেতৃত্বে হাজার হাজার পুলিশ বাহিনীর সদস্য এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিচার বিভাগসহ সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হচ্ছে।

অনেক নাগরিকের দৃষ্টিতে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ও বাংলাদেশকে নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক ধ্বংসই নয়, গত দুই বছরে এমন কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নেই, যা আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হয়নি। গত দুই বছরে রাজনীতির নামে লক্ষ লক্ষ বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট হয়েছে। অস্থিরতার পাশাপাশি মব সহিংসতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশ্যে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে উল্লাস করা, মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে নির্যাতন, মবের মাধ্যমে ছাত্রদের কর্তৃক শিক্ষকদের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতনসহ এমন অসংখ্য মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম এই মীরজাফর ওয়াকারের নেতৃত্বে হয়েছে। ইতিহাসে তার মীরজাফরি সকলকে হার মানায়।

এই ওয়াকার সেদিন ৫ আগস্ট সকল মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিল। সেটি ছিল তার অভিনয়। সে তার দুই বছরের সকল কর্মকাণ্ডে প্রমাণ করেছে যে, সে পাকিস্তানি এজেন্ট। এই দেশের মানুষের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি সে মেনে নিতে পারে না। তাই একটি সাজানো-গোছানো দেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। সে জানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অংশ। বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা সংকটে পড়া কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়া—এসবের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। যখন মানুষের আয় কমে যায় অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকে, তখন খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক আস্থা হারালে একটি জাতির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা আমাদের দেশে ওয়াকার গং-এর নেতৃত্বে ঘটেছে। তারা মানুষের হতাশাকে পুঁজি করে এখন ধর্মের রাজনীতিকে মানুষের মননে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এর প্রমাণ জামায়াত-শিবিরের মৌলবাদীদের ব্যাপক উত্থান।

ইতিহাস আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়—বেইমান কখনোই মানুষের মনে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই জন্ম দিতে পারে না। সহিংসতা কখনো স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না। প্রতিশোধের রাজনীতি, ঘৃণার ভাষা এবং বিভক্তির সংস্কৃতি কোনো জাতিকে শক্তিশালী করে না; বরং তাকে আরও দুর্বল করে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকের নিরাপত্তার ওপর। তাই তো মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, ৫ আগস্ট ছিল একটি দেশি-বিদেশি চক্রান্ত; তারা মীরজাফরদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে। তাই তারা আরও আগ্রহী হয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাঁর সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, যে মীরজাফরি হয়েছে, তার প্রতিদান দিতে চায়। আর ওয়াকার ও মীরজাফরদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে চায়। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু ঘৃণা থাকবে না; ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের নিরাপত্তা অটুট থাকবে।

ইতিহাস কাউকে চিরস্থায়ী ক্ষমতা দেয় না, কিন্তু ইতিহাস সবার কর্মকে স্মরণে রাখে। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো এমন একটি রাষ্ট্র গড়া, যেখানে সত্যকে ভয় করা হবে না, ন্যায়বিচারকে বিলম্বিত করা হবে না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভক্ত নয়—ঐক্যবদ্ধ একটি বাংলাদেশ উপহার দেওয়া হবে। আর তা-ই হবে পরবর্তী বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের আদর্শ।

লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক