ট্রাম্পের শুল্ক হুঙ্কারে ও ব্রিকসের পাল্টা চাল: ভারতে পুতিন-জিনপিংয়ের উপস্থিতি ও নতুন বৈশ্বিক সমীকরণ ‘সময় বদলে যাচ্ছে’, ট্রাম্পকে বার্তা মোদির! ‘শক্তিশালী’ ভারত দেখলেন পুতিন-জিনপিংও:
আন্তর্জাতিক রাজনীতির মানচিত্রে শক্তির ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে একক কোনো শক্তির একচ্ছত্র প্রভাব হ্রাস পেয়ে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা বা ‘মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড অর্ডার’-এর ভিত শক্তিশালী হওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে। ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য এবং নীতিগত অবস্থান এই পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করেছে। ওয়াশিংটনের শুল্ক হুঁশিয়ারি এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক বলয়ের চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে মোদির মোক্ষম বার্তা কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বিশেষ নজর কেড়েছে।
ডলারের আধিপত্য ও শুল্কের হুঁশিয়ারি: ব্রিকসের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখা এবং ব্রিকস জোটের বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো ডলারের বিকল্প খুঁজলে বা ‘ডি-ডলারাইজেশন’-এর পথে হাঁটলে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
এই চরম অর্থনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ব্রিকস সদস্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধির কৌশলগত সিদ্ধান্তে জোর দিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয় যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয় উপেক্ষা করেই সদস্য দেশগুলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যের বৈচিত্র্যায়নে পিছপা হচ্ছে না।
ব্রিকস সামিটের মূল কূটনৈতিক বার্তা
বৈশ্বিক বার্তা: একক শক্তির একচ্ছত্র রাজত্বের যুগের অবসান। অর্থনৈতিক পদক্ষেপ: স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যে জোর ও ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো।
ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান: কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা (ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি)।
‘সময় বদলে যাচ্ছে’: ব্রিকস মঞ্চে নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য বিশ্লেষণ
সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশেষ বার্তা বহন করে। তাঁদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদি যে বক্তব্য প্রদান করেন, তা মূলত তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
ঐক্য ও সর্বসম্মত অবস্থান: মোদি স্পষ্ট করেন যে গত দুই দশকে ব্রিকস তার পরিপক্বতা অর্জন করেছে। এটি কোনো জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মঞ্চ নয়, বরং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিশ্বমঞ্চে দৃশ্যমান ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলার স্থান।
মানবিকতা ও উদ্ভাবন: ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মানবতা, সহনশীলতা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবনের কথা উল্লেখ করা হয়।
সামুদ্রিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা: বৈশ্বিক বাণিজ্যের ‘তৈলধমনী’ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক নাবিকদের সুরক্ষায় একটি জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং বিশ্বরাজনীতির নতুন সমীকরণ
ব্রিকস সম্মেলনে শি জিনপিং ও পুতিনের সাথে নরেন্দ্র মোদির সুসম্পর্কের বার্তা শুধু একটি জোটের অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy)-এর শক্তিশালী প্রতিফলন। ওয়াশিংটনের চাপ সত্ত্বেও ভারত যে নিজস্ব বৈশ্বিক অংশীদার নির্বাচনে সম্পূর্ণ স্বাধীন, তা বিশ্বমঞ্চে প্রমাণিত। কৌশলগত দিক প্রচলিত পরিস্থিতি ব্রিকস মঞ্চে মোদির বার্তা বৈশ্বিক নেতৃত্ব একমেরু বিশ্ব (Unipolar World) বহুমুখী বিশ্ব ও ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য অর্থনৈতিক বাণিজ্য ডলারভিত্তিক সর্বজনীন বাণিজ্য স্থানীয় মুদ্রার প্রসার ও বৈচিত্র্যময় বাণিজ্য কূটনৈতিক কৌশল একক বলয়ে অবস্থান বহুপাক্ষিক জোট ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত
বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস আজ আর কেবল ৫টি বা ১০টি উদীয়মান অর্থনীতির সম্মেলন নয়; এটি বৈশ্বিক দক্ষিণ বা ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছে। ভারতের কৌশলগত অবস্থান একদিকে যেমন পশ্চিমা শক্তির সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখে, অন্যদিকে তেমনই অর্থনৈতিক উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
আজ বিশ্বরাজনীতির বার্তাটি খুব পরিষ্কার—কূটনীতির ময়দানে একক আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে এবং শক্তির এক নতুন ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তবতায় প্রবেশ করছে বিশ্ব।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
মহাকাশ থেকে ছায়াযুদ্ধ: মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার নেপথ্যে কি তবে চিনা কৃত্রিম উপগ্রহ? মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে মহাকাশ গোয়েন্দাগিরির নতুন সমীকরণ
বাংলাদেশ কি চরম সংকটের দ্বারপ্রান্তে? — প্রবৃদ্ধি, শাসনব্যবস্থা ও টিকে থাকা
আগুনের বৃত্তে বাঁধা পৃথিবী: ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে পারস্যের বিষণ্ণ সন্ধ্যা