মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

অভ্যন্তরীণ সংকট, আদর্শিক অবক্ষয় ও ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশ আওয়ামী লীগের আদর্শিক বিচ্যুতি, সুবিধার রাজনীতি, মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও জামায়াতীকরণের অভ্যন্তরীণ চালচিত্র। পর্ব ১:

লিখেছেন: ঈশ্বর ভট্টাচার্য, কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২০ এএম
অভ্যন্তরীণ সংকট, আদর্শিক অবক্ষয় ও ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশ  আওয়ামী লীগের আদর্শিক বিচ্যুতি, সুবিধার রাজনীতি, মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও জামায়াতীকরণের অভ্যন্তরীণ চালচিত্র।  পর্ব ১:

১. সমকালীন রাজনীতির পটভূমি: আদর্শিক শূন্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী ধারার নিরন্তর দ্বন্দ্বের ইতিহাস। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রভাবনা, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলতার আগ্রাসন। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় সমকালীন বাংলাদেশে প্রগতিশীলতার প্রধান ধারক দাবিদার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ গঠনে এক গভীর সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল কিংবা সাধারণ দলীয় কোন্দলের বিষয় নয়; এটি একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী আদর্শিক অবক্ষয়।

যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা দল যখন তার ঐতিহাসিক চেতনা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার ভেতরে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি হয়। ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব বা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঢাকঢোল পিটিয়ে এই আদর্শিক দেউলিয়াত্ব ঢেকে রাখা সম্ভব হয় না। একটি রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে—তা কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত কিংবা অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের চালিকাশক্তির মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ভিত্তির ওপর।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন তার আদর্শিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ শিথিল করে দেয়, তখন বিরোধী ভাবাদর্শের অনুপ্রবেশ কেবল অনিবার্যই হয়ে ওঠে না, তা দলের স্বাভাবিক অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলে দেয়। সমকালীন রাজনীতিতে আমরা দেখছি একদিকে ক্ষমতার দৃশ্যমান বিস্তার, অন্যদিকে প্রগতিশীল চিন্তা ও দলের মূল আদর্শের গভীর পশ্চাদপসরণ। এই দুইয়ের বৈপরীত্যই বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটকে ঘনীভূত করেছে।

দলের এই আদর্শিক অবক্ষয়টি মূলত এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। প্রথমত, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ঘোর নিষ্ক্রিয়তা তৈরি হয়। এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে দলে সুবিধাবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলশ্রুতিতে, দলের ভেতরে সৃষ্টি হয় এক গভীর আদর্শিক শূন্যতা। এই শূন্যতার চূড়ান্ত পরিণতিই হলো দলের মূল মনস্তত্ত্বে ‘জামায়াতীকরণ’ বা মৌলবাদী মূল্যবোধের ছদ্মবেশী আধিপত্য বিস্তার।

২. 'জামায়াতীকরণ'-এর তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ

রাজনীতিতে 'জামায়াতীকরণ' বা মৌলবাদীকরণ কোনো সাধারণ দলীয় অনুপ্রবেশের ঘটনা নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর। সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনে কোনো ভাবাদর্শের ছদ্মবেশী প্রবেশকে বোঝার জন্য ইতালীয় তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশির 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য' বা আধিপত্য বিস্তারতত্ত্ব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গ্রামশির মতে, কোনো শাসক বা রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘকাল জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে তাকে সমাজের মনোজগতে নিজস্ব চিন্তার প্রাধান্য তৈরি করতে হয়।

যখন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো দেখতে পায় যে তারা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রগতিশীল শক্তির সাথে জয়ী হতে পারছে না, তখন তারা ছদ্মবেশ ধারণ করে। তারা প্রতিপক্ষ দল বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ব্যানার, স্লোগান ও প্রতীকের আড়ালে নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করে। বাহ্যিকভাবে আওয়ামী লীগ বা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সেজে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করলেও, তাদের অন্তরে লালিত হয় মৌলবাদী, অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ।

এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বৈততাকে বলা যায় 'ভাবাদর্শিক ছদ্মবেশ'। একজন ব্যক্তি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধুর নামজপ করতে পারেন কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে পারেন, কিন্তু তার দৈনন্দিন চিন্তাধারা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতি অনাস্থা স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি প্রকৃতপক্ষে এক ছদ্মবেশী মৌলবাদের ধারক। রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বের বিচারে এটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষাব্যূহ ধ্বংসের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

৩. ক্ষমতার রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সুবিধাবাদের বিস্তার

রাজনৈতিক অর্থনীতির মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ক্ষমতা ও বিত্তের সাথে রাজনৈতিক আদর্শের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিদ্যমান। দীর্ঘ সময় ক্ষমতাকেন্দ্রে অবস্থান করলে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তার সুসংগঠিত তাত্ত্বিক কাঠামো হারিয়ে ফেলে সুবিধা বণ্টনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। মার্ক্সীয় দর্শনে 'শ্রেণি চেতনা' এবং 'মিথ্যা চেতনা' ধারণার মাধ্যমে এই রূপান্তর চমৎকারভাবে অনুধাবন করা যায়।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতার রাজনীতিতে যুক্ত থাকা বড় একটি গোষ্ঠী মূলত ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক পুঞ্জীভবনের স্বার্থে দলের ব্যানার ব্যবহার করে। তাদের রাজনীতিতে না আছে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতি আত্মিক অনুগত অবস্থা, না আছে সামাজিক সাম্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি, সরকারি পদ-পদবি এবং অন্যান্য সুবিধা হাসিলের জন্য তারা যে রাজনৈতিক পোশাকটি পরেন, তা নেহাতই একটি বাণিজ্যিক আবরণ।

বিচার্য বিষয় আদর্শিক প্রগতিশীল কর্মী ছদ্মবেশী সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক প্রেরণা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লাভ তোলা সংকটকালীন ভূমিকা ঝুঁকি নিয়ে নীতিতে অটল থাকা ও রাজপথে লড়াই পরিস্থিতি অনুযায়ী নিষ্ক্রিয়তা, দলত্যাগ বা ছদ্মবেশ জীবন ও সংস্কৃতি অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক জীবনচর্চা প্রচ্ছন্নভাবে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদকে তোষণ সংবিধানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ১৯৭২ সালের মূলনীতির প্রতি আপসহীন ভূমিকা ক্ষমতার সুবিধার্থে যেকোনো আপস করতে প্রস্তুত

এই বৈপরীত্যের কারণে ক্ষমতার আশপাশে এমন এক শ্রেণিকাঠামোর উত্থান ঘটে, যারা সুবিধাজনক সময়ে যেকোনো আদর্শকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে। আদর্শভিত্তিক কর্মী তৈরির প্রক্রিয়া যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেখানে অনুপ্রবেশ ঘটে এমন সুযোগসন্ধানীদের, যাদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয় ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলতার উর্বর জমিতে।

৪. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিভ্রম ও সাংস্কৃতিক শূন্যতা

বিগত কয়েক দশকে অবকাঠামোগত দিক থেকে বাংলাদেশ দৃশ্যমান প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বড় বড় সেতু, উড়ালসড়ক এবং অর্থনৈতিক নির্দেশকের ঊর্ধ্বগতি নিশ্চিতভাবেই দেশের সক্ষমতার পরিচয় দেয়। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই সমান্তরালে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক বিশাল শূন্যতা। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক সময় এই ভুল ধারণায় পরিচালিত হয়েছে যে কেবল অর্থনৈতিক সন্তুষ্টি দিয়ে সমাজের মন জয় করা সম্ভব এবং এর মাধ্যমেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

সমাজবিজ্ঞানে এই দৃষ্টিভঙ্গীকে 'অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদ'-এর ভুল প্রয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক থিওডোর অ্যাডোর্নো এবং ম্যাক্স হর্কহাইমার তাঁদের সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছেন, কেবল বস্তুতাত্ত্বিক সমৃদ্ধি অর্জিত হলে যদি সাংস্কৃতিক জগত স্থবির বা অপসংস্কৃতি দ্বারা দখল হয়ে যায়, তবে সেই সমাজ ভেতরে ভেতরে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ যখন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ব্যস্ত ছিল, তখন সমাজ থেকে নাট্যচর্চা, আবৃত্তি, মেলা, চারুকলা এবং মেধাভিত্তিক চর্চার ময়দানগুলো ফাঁকা হতে শুরু করেছিল। এই খালি জায়গায় চেপে বসেছে প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তি। অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে ধর্মীয় আলোচনা, মৌলবাদী প্রচার এবং ইন্টারনেটভিত্তিক কুসংস্কার তরুণদের মনোজগত দখল করে নেয়। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলেও একটি জাতি যখন সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে পড়ে, তখন তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।

৫. সুশীল ছদ্মবেশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তির ফাঁদ

সমকালীন সময়ে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরির বড় হাতিয়ার হলো 'সুশীল ছদ্মবেশধারী' বুদ্ধিজীবী সমাজ। বিভিন্ন গণমাধ্যম, আলোচনা অনুষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন এক ধরণের তাত্ত্বিক বা বিশ্লেষক গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে, যারা আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ, মার্জিত ও গণতান্ত্রিক ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু সূক্ষ্মভাবে আওয়ামী লীগের মূল ভাবাদর্শ ও প্রগতিশীল চিন্তার মূলে আঘাত হানেন।

ফরাসি চিন্তাবিদ জাঁ-পল সাত্রে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, একজন খাঁটি বুদ্ধিজীবীকে সবসময় সত্যের পক্ষে এবং শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, এমনকি তা নিজের বা প্রিয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গেলেও। কিন্তু যখন বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের আখের গোছাতে কিংবা সুযোগসন্ধানী লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে সত্যকে বাকপটুতার আড়ালে লুকিয়ে ফেলেন, তখন সাধারণ মানুষের মাঝে মারাত্মক বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

এই সুবিধাবাদী চিন্তাবিদরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ধোঁয়াশাপূর্ণ করে তোলেন, মৌলবাদকে 'জনগণের অধিকার' হিসেবে চটকদার বয়ানে উপস্থাপন করেন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে উগ্রতার সাথে তুলনা করার অপচেষ্টা চালান। তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে কোনটা প্রগতিশীল আর কোনটা প্রতিক্রিয়াশীল—তা সাধারণ তরুণদের পক্ষে চেনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিষবাষ্পের মোকাবিলা করা আওয়ামী লীগের আদর্শিক পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।

লেখক: ঈশ্বর ভট্টাচার্য, কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক