মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

কূটনীতির আড়ালে সত্য অনুসন্ধান: আইপিইউ প্রধানের ঢাকা সফর ও মানবাধিকারের প্রশ্ন, বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষায় বাংলাদেশ ।

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ৩:৪৫ পিএম
কূটনীতির আড়ালে সত্য অনুসন্ধান: আইপিইউ প্রধানের ঢাকা সফর ও মানবাধিকারের প্রশ্ন, বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষায় বাংলাদেশ ।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সংসদীয় কূটনীতির মঞ্চে এক অভূতপূর্ব টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে নির্বাচিত জাতীয় সংসদগুলোর সর্বোচ্চ অভিভাবক সংস্থা ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে গভীর কৌতূহল ও উদ্বেগের হাওয়া। আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের উদ্দেশ্য নতুন জাতীয় সংসদের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা বলা হলেও, পর্দার আড়ালের মূল প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল।

একাধিক আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যমতে, এটি নিছক কোনো প্রোটোকল সফর নয়; বরং বাংলাদেশের সাবেক ৭০ জন সংসদ সদস্যের ওপর ওঠা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং কারান্তরালে নির্যাতনের অভিযোগ সরেজমিনে তদন্তের এক জরুরি মিশন। ১৮৩টি দেশের সদস্য সংসদ নিয়ে গঠিত ১৮৭ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী বহুপাক্ষিক সংস্থটি এর আগে বাংলাদেশের সাবেক সংসদ সদস্যদের ওপর চলা এই নিপীড়নকে "সুসংগঠিত রাজনৈতিক নিধন এবং প্রতিশোধের মহোৎসব" হিসেবে বর্ণনা করেছে।

আইপিইউ সদর দপ্তরে জমা পড়া নথিপত্র এবং ইস্তাম্বুলে গৃহীত সর্বসম্মত প্রস্তাব অনুযায়ী, বেশ কয়েকজন হাই-প্রোফাইল সাবেক সংসদ সদস্যের শারীরিক অবস্থা ও আইনি অধিকার নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে আইপিইউ-এর অনারারি প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী, আইপিইউ গভর্নিং কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি ফজলে করিম চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূর, মোশাররফ হোসেন, হাবিব মিল্লাত এবং সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ ফারুক খানের মতো ব্যক্তিত্বদের ওপর হওয়া নির্যাতন ও শারীরিক আঘাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংস্থাটির নজর কেড়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া, জামিন পেয়েও মুক্তি না পাওয়া, এবং গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও জরুরি বিশেষায়িত চিকিৎসা না দেওয়ার মতো অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী।

মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপের এই সফরের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপোড়েন। আইপিইউ-এর পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে নিরপেক্ষ ট্রায়াল অবজারভার বা বিচার পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ভিসা মেলেনি। অবশেষে তানজানিয়ার আরুশায় আগামী আইপিইউ অ্যাসেম্বলিতে বাংলাদেশের ওপর কোনো কঠিন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত এড়াতেই এই সফরের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

আইপিইউ কোনো সরাসরি আদালত না হলেও, এর "কমিটি অন দি হিউম্যান রাইটস অব পার্লামেন্টিয়ানস"-এর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা অপরিসীম। পূর্বে ইরাকের বন্দি সংসদ সদস্যদের মুক্তির পেছনেও সংস্থাটির এই রাজনৈতিক প্রভাব অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। ঢাকা সফরে এসে মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ এখন সরাসরি সরকারের শীর্ষ মহলের সাথে বৈঠকে স্বাধীন তদন্তের অনুমোদন এবং কারাবন্দি নেতাদের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ চাইবেন।

বিশ্বের কাছে কোনো দেশের সংসদীয় ব্যবস্থার সুনাম তার গণতন্ত্রের আয়না স্বরূপ। আইপিইউ-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ আজ এক বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি। এই স্বাধীন তদন্ত এবং তার পরবর্তী প্রতিবেদন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকার ভাবমূর্তিকে কোন দিকে মোড় ঘোরায়, তা দেখতে এখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে ঢাকার দিকে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)