মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণ: দিল্লির পরামর্শেই কি ঢাকার দিকে হাত বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন?

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩:৫৯ পিএম
দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণ: দিল্লির পরামর্শেই কি ঢাকার দিকে হাত বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন?

প্রথম পর্ব

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সূচিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের কূটনীতির টানাপোড়েন, গোপন বৈঠক এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নীতিগত রূপান্তর এখন প্রকাশ্য আলোচনায়। দীর্ঘ দিন ধরে ওয়াশিংটন ঢাকা নীতির ক্ষেত্রে যে অবস্থান নিয়েছিল, তাতে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা অবশেষে উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বপ্রধান ভূ-রাজনৈতিক শক্তি তথা ভারতের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব প্রভাব বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব। বিশেষ করে, এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব রুখতে নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের স্বার্থ এখন একই বিন্দুতে এসে মিলেছে।

জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত শঙ্কা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ঘটনার সূত্রপাত এবং গোয়েন্দা তথ্যের জটিল বুনন বুঝতে হলে কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে হবে। ভারতীয় ভূখণ্ড ও সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলের নিরাপত্তাকে সুসংহত করতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল দীর্ঘদিন ধরেই তৎপর। সীমান্ত পরিদর্শনের পর গোয়েন্দা সূত্রে যে খবর বেরিয়ে আসে, তাতে দেখা যায়—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পুনঃউত্থান ভারতের পূর্ব সীমান্তে এক বিরাট নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে, নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও চরমপন্থী সংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলোতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করে।

দিল্লি অনুধাবন করে, বাংলাদেশে যদি রাজনৈতিক চরমপন্থা ও ভারতবিরোধী মনোভাব প্রবল হয়, তবে তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলবে। আর এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তন। শুরুতে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন জানালেও, পরবর্তীতে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মার্কিন নীতি নির্ধারকরা কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।

সার্জিও গোর-এর ঢাকা সফর ও গোপন ফাইলের বার্তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত দূত সার্জিও গোর-এর বাংলাদেশ সফর কূটনৈতিক পাড়ায় তোড়জোড় সৃষ্টি করেছে। সূত্রের খবর, তিনি ঢাকায় এসে বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে তিনি একটি বিশেষ নথি বা কনফিডেনশিয়াল ফাইল হস্তান্তর করেছেন বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল জোর গুঞ্জন শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নথিতে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির যৌথ আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা ছিল সুস্পষ্ট। প্রথমত, বাংলাদেশে আগামী ২০২৭ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে একটি সর্বজনগ্রাহ্য, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বার্তা দেওয়া হয়েছে—যেখানে আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য সমস্ত বড় রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট পথ উন্মুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে তাঁর দেশে ফেরার রাজনৈতিক পথ সুগম করার বিষয়টি জোর দেওয়া হয়েছে।

একই সফরে সার্জিও গোর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর সাথেও দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এই বৈঠক থেকেই বার্তা স্পষ্ট হয়—দক্ষিণ এশিয়ায় চীনকে প্রতিহত করতে এবং চরমপন্থা পুরোপুরি দমন করতে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি এখন সম্পূর্ণ একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত। ঢাকাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, দিল্লির সাথে বাড়তে থাকা কূটনৈতিক দূরত্ব অবিলম্বে কমিয়ে আনতে হবে, অন্যথায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিসরে নতুন ধরণের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারে ঢাকার রাজনীতি।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)