মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

ডেঙ্গু জ্বর: কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ তিন পর্বের বিশেষ ধারাবাহিক

লিখেছেন: অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বিএসএমএমইউ। প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
ডেঙ্গু জ্বর: কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ তিন পর্বের বিশেষ ধারাবাহিক

প্রথম পর্ব: ডেঙ্গু জ্বরের কারণ, লক্ষণ ও বর্তমান রূপ

জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন, সারাদেশে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক সময়সূচি এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা এখন আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো ঋতুতে সীমাবদ্ধ নেই। ইতিপূর্বে ধারণা করা হতো বর্ষাকালই ডেঙ্গুর একমাত্র মৌসুম, কিন্তু বর্তমানে বছরজুড়েই মশার প্রজনন অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে। টানা বা থেমে থেমে বৃষ্টিপাত, বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা এবং বাসাবাড়ি ও আশপাশের নানা জায়গায় জমে থাকা পরিষ্কার পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির আদর্শ ক্ষেত্র তৈরি করছে। ফলে বর্ষার শুরুতেই আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে এবং দেশের ছোট-বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের মূল কারণ ও সংক্রমণ প্রক্রিয়া

ডেঙ্গু মূলত একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত দুই প্রজাতির এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়—এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস (Aedes albopictus)। এর মধ্যে এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতিটি মানুষের বসতবাড়ি, বারান্দা, নগর অঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাস সাধারণত গ্রাম, ঝোপঝাড় বা প্রাকৃতিক পরিবেশে বংশবৃদ্ধি করে। যখন কোনো জীবাণুবাহী এডিস মশা সুস্থ কোনো মানুষকে কামড়ায়, তখন ভাইরাসের সুপ্তিকাল হিসেবে ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে সেই ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। একইভাবে, এই ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো রোগীকে যদি কোনো জীবাণুমুক্ত বা সাধারণ এডিস মশা কামড়ায়, তবে সেই মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহকে পরিণত হয়। এভাবে একটি মশার মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে দ্রুত এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন ও জটিলতা

ডেঙ্গু ভাইরাসের মূলত ৪টি ভিন্ন সেরোটাইপ বা প্রজাতি রয়েছে—ডেন-১ (DEN-1), ডেন-২ (DEN-2), ডেন-৩ (DEN-3) এবং ডেন-৪ (DEN-4)। একজন ব্যক্তি জীবনে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। কোনো নির্দিষ্ট সেরোটাইপ দিয়ে একবার আক্রান্ত হলে রোগী সেই নির্দিষ্ট প্রজাতিটির বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেন। তবে অন্য ৩টি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে তাঁর স্থায়ী সুরক্ষা থাকে না। ফলে জীবনে সর্বোচ্চ ৪ বার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যারা জীবনে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ভিন্ন কোনো সেরোটাইপ দিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, তাদের ক্ষেত্রে শারীরিক জটিলতা এবং প্রাণহানির ঝুঁকি প্রথমবারের চেয়ে বহু গুণে বৃদ্ধি পায়।

চিরাচরিত লক্ষণ ও ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড

ডেঙ্গু জ্বরের ক্লাসিক্যাল বা প্রাথমিক লক্ষণের মধ্যে প্রধান হলো হঠাৎ প্রচণ্ড তীব্র জ্বর, যা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। সঙ্গে থাকে সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা। বিশেষ করে মেরুদণ্ড, কোমর, পিঠ, অস্থিসন্ধি (Joints), মাংসপেশি, মাথা এবং চোখের পেছনের অংশে তীব্র যন্ত্রণা হয়। ব্যথার তীব্রতা এতটাই বেশি থাকে যে মনে হয় যেন হাড় ভেঙে যাচ্ছে, আর এই কারণেই প্রাচীনকাল থেকে এই জ্বরের অপর নাম "ব্রেকবোন ফিভার" (Breakbone Fever)। শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যথার অনুভূতি প্রকাশ করতে না পেরে স্পর্শ করলেই কেঁদে ওঠে এবং তারা প্রচণ্ড খিটখিটে মেজাজের হয়ে পড়ে।

সাধারণত জ্বর আসার ৪ থেকে ৫ দিনের মাথায় সারা শরীরে এলার্জি বা ঘামাচির মতো লালচে দানা বা স্কিন র‍্যাশ (Skin Rash) দেখা দেয়। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব, অবিরাম বমি, মুখে অরুচি ও চরম শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে অনেক সময় "বাইফেজিক ফিভার" (Biphasic Fever) বলা হয়, কারণ ৪-৫ দিন পর জ্বর সাময়িক কমে গিয়ে আবার ২-৩ দিন পর নতুন করে দেখা দিতে পারে।

অধিকাংশ রোগী ও স্বজনেরা মনে করেন জ্বর কমে গেলেই রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। অথচ মূল বিপদ শুরু হয় ঠিক এই সময়েই, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় “ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড” (Critical Period)। এই সময় রক্তের অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট (Platelet) দ্রুত কমতে শুরু করে এবং রক্তনালীর কৈশিক জালিকা থেকে রস নিসৃত হতে থাকে। এর ফলে শুরু হয় "ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর" (Dengue Hemorrhagic Fever)।

এই অবস্থায় শরীরের বিভিন্ন সূক্ষ্ম অংশ থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে—যেমন চামড়ার নিচে লাল লাল ছোপ, নাক ও মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, কফের সঙ্গে রক্ত আসা, রক্তবমি হওয়া, পায়খানার সঙ্গে তাজা রক্ত বা আলকাতরার মতো কালো পায়খানা হওয়া। মেয়েদের ক্ষেত্রে মেয়াদের আগেই মাসিক শুরু হওয়া বা অতিরিক্ত রক্তস্রাব হতে পারে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো চোখের ভেতরে-বাইরে এমনকি মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রেও অনিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে পারে। এর ফলে শরীরের রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, যাকে "হাইপোভলিউমিক শক" (Hypovolemic Shock) বলে। এ ছাড়া ফুসফুস ও পেটে পানি জমা, লিভার আক্রান্ত হয়ে জন্ডিস হওয়া এবং কিডনি বিকল (Renal Failure) হয়ে রোগী দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্তসংবহনতন্ত্র পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় "ডেঙ্গু শক সিনড্রোম" (Dengue Shock Syndrome - DSS)। এতে নাড়ির স্পন্দন (Pulse) অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হয়, হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়, প্রস্রাব কমে যায় এবং রোগী চেতনা হারিয়ে ফেলেন।

উপসর্গ ও মশার আচরণের পরিবর্তন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন ও লক্ষণাবলীতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখন আর অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই আগের মতো উচ্চ তাপমাত্রা, তীব্র হাড় ভাঙা ব্যথা বা স্কিন র‍্যাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং শুরুতে মৃদু জ্বর, হঠাৎ জ্বর আবার ভালো হয়ে যাওয়া, কাশি, মৃদু পেট ব্যথা, বমি, হালকা পাতলা পায়খানা বা হাত-পা ফোলার মতো সাধারণ উপসর্গ নিয়ে রোগীরা আসছেন। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই রক্তচাপ ও প্রস্রাব আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে এবং লিভার বা মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরি হচ্ছে। লক্ষণ স্পষ্ট না থাকায় রোগীরা সাধারণ মৌসুমি জ্বর মনে করে ঘরে বসে সময়ক্ষেপণ করছেন। ফলে একদম শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত জটিল অবস্থায় তারা হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছেন।

একইভাবে কীটতত্ত্ববিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, এডিস মশার আচরণেও বড় ধরনের বদল এসেছে। আগে ধারণা করা হতো এডিস মশা কেবল সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় অর্থাৎ সকালে ও বিকেলে কামড়ায়। কিন্তু বর্তমানে এটি প্রমাণিত যে, কৃত্রিম বা উজ্জ্বল আলোর উপস্থিতিতে দিনে কিংবা রাতে যেকোনো সময় এডিস মশা কামড়াতে পারে। এই পরিবর্তন ডেঙ্গুর ভয়াবহতাকে সর্বব্যাপী করে তুলেছে।

লেখক: অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বিএসএমএমইউ।