মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

ব্যায়ের পাহাড় বনাম ঋণের বোঝা: পে-স্কেলের বৈষম্য ও বোয়িং চুক্তির অর্থনৈতিক টানাপোড়েন

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
ব্যায়ের পাহাড় বনাম ঋণের বোঝা: পে-স্কেলের বৈষম্য ও বোয়িং চুক্তির অর্থনৈতিক টানাপোড়েন

অর্থনৈতিক নীতি ও অগ্রাধিকারের টানাপোড়েনে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি আজ বাংলাদেশ। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ-ত্রিগুণ করার ঘোষণা, অন্যদিকে বিপুল ঋণের দায় মাথায় নিয়ে কোটি কোটি ডলারের মার্কিন উড়োজাহাজ বোয়িং ক্রয়ের কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা—দুই মিলে দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সরকারি পে-স্কেল ও বাড়তে থাকা সামাজিক বৈষম্য রাজধানীতে একজন শিক্ষানবিস এমবিবিএস চিকিৎসক যেখানে মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতন পান, ঢাকার বাইরে তা নেমে আসে মাত্র ১৫ হাজার টাকায়। অথচ ঘোষিত পে-স্কেলে একজন ২০তম গ্রেডের সরকারি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মাসে পাবেন ৩৩ হাজার টাকার বেশি। ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেলের পর সরকার ভবিষ্যতে আর পে-কমিশন না করার ঘোষণা দিলেও এক দশকের মাথায় সেই অবস্থান থেকে সরে আসা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে ১০০ শতাংশ এবং ১৯ ও ২০তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে ১ম শ্রেণির কর্মকর্তার প্রারম্ভিক আয় দাঁড়াবে ৭০ হাজার টাকার উপরে।

বিপরীতে, দেশের ৬০ থেকে ৭০ লাখ বেসরকারি কর্মচারীর বড় অংশই চরম বেতন বৈষম্যের শিকার। বহুজাতিক সংস্থা ও কিছু ব্যাংক ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিসদের বেতন অত্যন্ত হতাশাজনক। এতে ক্ষোভ বাড়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উদ্দীপনা ও দক্ষ কর্মী ধরে রাখার সক্ষমতা ভেস্তে যেতে বসেছে। বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, গত ১১ বছরে মূল্যস্ফীতি ৮২ শতাংশ বাড়লেও সরকারের টানা প্রণোদনা ও ইনক্রিমেন্টে সরকারি কর্মীরা পিছিয়ে ছিলেন না। তাই নতুন এই বিশাল বেতন বৃদ্ধি প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে আরও উসকে দেবে। পাশাপাশি, নতুন স্কেল বাস্তবায়নে প্রতি বছর যে অতিরিক্ত ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে, তার রাজস্ব সংস্থান কোত্থেকে আসবে তা স্পষ্ট নয়; যেখানে ইতোমধ্যেই চলতি অর্থবছরের শুরুতেই হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে।

উন্নয়ন নাকি শুল্ক ছাড়ের কূটনীতি: বোয়িং কেনার বিপুল দায় বেতন কাঠামোর এই অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের টানাপোড়েনে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে এক চরম ব্যয়বহুল কেনাকাটায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা) মূল্যে ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তিতে পৌঁছেছে। এমনকি মার্কিন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এই ক্রয়ের পরিধি আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে।

অবশ্য বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ নিয়ে পরিচালিত বিমান ২০৩৪-৩৫ সালের মধ্যে বহর ৪৭টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কেবলই এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধি, নাকি কূটনৈতিক দর-কষাকষির বলির পাঁঠা?

২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ মার্কিন পণ্য কেনার আশ্বাস দেয়। পরবর্তীতে তৈরি পোশাকের ওপর শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে আনা হয় এবং তার পরপরই বোয়িং চুক্তির ঘোষণা আসে। এছাড়া ইউরোপের এয়ারবাস থেকেও উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।

ভবিষ্যতের ঋণ ও অদূরদর্শী নীতি বোয়িং বিমান কেনার এই বিশাল অঙ্কের অর্থায়নে বিমান বাংলাদেশকে যে অর্থ ঋণ নিতে হবে, তার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দিতে হবে সরকারকেই। অর্থাৎ, বিমান যদি ব্যবসায়িক ক্ষতি বা ব্যর্থতার মুখে পড়ে, তবে এই বিলিয়ন ডলার ঋণের দায়ভার এসে পড়বে দেশের সাধারণ জনগণের ঘাড়েই।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ঢালাও বেতন বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক সুবিধা পেতে বিপুল ঋণের বোঝা ঘাড়ে নেওয়া—উভয় সিদ্ধান্তই রাষ্ট্রের দূরদর্শী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অভাবকে ফুটিয়ে তোলে। এই বিপুল রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের দায় সামলে বাংলাদেশ কি টেকসই অর্থনীতি বজায় রাখতে পারবে, নাকি অদূরদর্শিতার মাশুল গুণবে সাধারণ মানুষ—তা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)