সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে ২৪৫ প্রাণ, আক্রান্ত ৪৩৭৭৪: হাসপাতালের বারান্দায় দীর্ঘশ্বাস আর স্বজন হারানোর বেদনা: এর দায় কার?
একটি মাস কীভাবে কেড়ে নিতে পারে এতগুলো হাসিখুশি মুখ, এতগুলো সাজানো সংসার? সেপ্টেম্বর মাসটি আমাদের জন্য কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়, এটি ছিল যেন এক মৃত্যুর উপত্যকা। এই এক মাসেই ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে ১৪৮টি তাজা প্রাণ। চারপাশের বাতাসে যেন কেবল দীর্ঘশ্বাস আর স্বজন হারানোর বুকফাটা কান্নার রোল। যে শিশুরা সকালে হেসেখেলে স্কুলে যেত, যে তরুণেরা রঙিন স্বপ্ন দেখত চোখে, কিংবা যে বাবা-মায়েরা পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন—তারা আজ কেবলই এক একটি ঠান্ডা পরিসংখ্যান। চোখের পলকে নিভে যাওয়া এই প্রদীপগুলোর শূন্যতা কে পূরণ করবে?
হাসপাতালে উপচে পড়া বিছানা আর মৃত্যুর মিছিল
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কেবল গত ২৪ ঘণ্টাতেই প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৬ জন। আর পুরো বছরে মৃত্যুর সংখ্যাটা পৌঁছে গেছে ২৪৫টিতে। হাসপাতালের চার দেয়াল আজ যেন এক অন্তহীন আর্তনাদের সাক্ষী। যন্ত্রণায় ছটফট করা রোগীদের করুণ চাহনি আর স্বজনদের চোখে পানি—এই দৃশ্য আজ দেশের প্রায় প্রতিটি হাসপাতালের। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯৪৮ জন নতুন রোগী নিয়ে দেশের হাসপাতালগুলোর বারান্দা, মেঝে—কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, আর এর অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৪৩৭৭৪ জন মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন কেবল সেপ্টেম্বর এক মাসেই! আগস্ট মাসের তুলনায় যা দ্বিগুণেরও বেশি।
কেন এই ব্যর্থতা? কার ভুলে ঝরছে রক্তিম ফুল?
প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম মেনে বর্ষা আসে, কিন্তু সেই বর্ষা আজ আমাদের জীবনে ডেকে আনছে এক ভয়ংকর অভিশাপ। খুলনা, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম কিংবা রংপুর—দেশের প্রতিটি কোণ থেকে আসছে মৃত্যুর মিছিল। প্রশ্ন জাগে, আমাদের অবহেলা আর উদাসীনতা কি তবে প্রতিদিন এভাবেই কেড়ে নেবে আমাদের প্রিয়জনদের? হাসপাতাল থেকে ৭৩ হাজার ৮৯০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও, প্রতিদিনের এই নতুন আক্রান্ত আর মৃত্যুর খবর আমাদের বুক কেঁপে ওঠে। আর কত মায়ের কোল খালি হলে, আর কত বুক চেরা কান্নার শব্দ পেলে আমাদের টনক নড়বে?
আর একটিও প্রাণ নয়, এবার চাই সম্মিলিত প্রতিরোধ
সেপ্টেম্বরের এই ভয়ংকর পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমরা কতটা অরক্ষিত। এই মৃত্যুগুলো কেবল সংখ্যা নয়, একেকটি পরিবারের চিরস্থায়ী অন্ধকার। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে এখনই আমাদের সম্মিলিতভাবে এই মরণঘাতী মশাবাহিত ত্রাসকে রুখে দাঁড়াতে হবে। ব্যক্তিগত সচেতনতা আর কার্যকর পদক্ষেপই পারে আমাদের আগামী প্রজন্মকে এই করুণ পরিণতির হাত থেকে বাঁচাতে। আর একটিও প্রাণ যেন অকালে ঝরে না যায়—এটাই হোক আজকের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
শহর পেরিয়ে এখন গ্রামে গ্রামে কান্নার রোল: ডেঙ্গুর নীরব থাবায় নিভছে নিষ্পাপ শিশুদের জীবনপ্রদীপ
স্বজনদের ভারী নিঃশ্বাস আর অবুঝ শিশুর করুণ বিদায়: ডেঙ্গুতে ৩০০ ছুঁইছুঁই মৃত্যু, হামের থাবায় ঝরলো আরও ৮ তাজা প্রাণ
শিশুদের কান্না আর স্বজন হারানোর মিছিলে ভারী হচ্ছে বাতাস: মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে আমাদের চেনা ঢাকা শহর