সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

ইতিহাস বিকৃতি, মৌলবাদের উত্থান ও আলোর পথে ফিরে আসার অঙ্গীকার

লিখেছেন: শচীন বাঙালি প্রকাশিত: ২ আগস্ট ২০২৬, ৮:৫৫ এএম
ইতিহাস বিকৃতি, মৌলবাদের উত্থান ও আলোর পথে ফিরে আসার অঙ্গীকার

পৃথিবীতে কি এমন কোনো জাতি আছে, যাদের মধ্যে কেউ তাদের জাতীয় বীরদের—যারা জীবন দিয়ে, জেল খেটে, নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে একটি জাতির জন্ম ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন—তাদের অবদানকে অস্বীকার করে এবং ইতিহাস বিকৃত করে তাদের বিরুদ্ধে কুৎসিত মিথ্যা প্রচারণা চালায়? পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মিথ্যাচার ও রাজনৈতিক বিকৃতি শুধু এই বাংলাদেশেই সম্ভব। কারণ এই দেশে জামায়াতে ইসলামী নামে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল আছে। যারা ধর্মীয় অবাস্তব কুৎসা মানুষের মাঝে আল্লাহর দেওয়া বক্তব্য বলে চালিয়ে মানুষের মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা খর্ব করে রাজনীতিকে এক অন্ধকার যুগে নিয়ে যেতে চায়। সেই সঙ্গে মানুষের আধুনিক চিন্তা-উপলব্ধিকে ধর্মের পৌরাণিক কাহিনীকে আল্লাহর হুকুম বলে প্রচার করে এক অর্থডক্স জাতিতে পরিণত করে অন্ধকার যুগের আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে নিয়ে যেতে চায়। তার প্রমাণ হিসেবে তাদের নেতাদের ব্যক্তিগত জীবনের যৌন বিকৃত রুচিবোধকে নবী-রাসুলের সুন্নত বলে উপস্থাপন করা হয় এবং মাদ্রাসাগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার নামে মধ্যযুগীয় শিশু বলাৎকার ও যৌন নির্যাতনের মহোৎসব চলছে। তা ছাড়া এই মৌলবাদী গোষ্ঠী পৃথিবীর আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর জীবনধারাকে আল্লাহর বিরুদ্ধে নাজায়েজ বলে প্রচার দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তারা কোনো দৃশ্যত কাজকর্ম না করে মানুষকে কর্মবিমুখ জাতিতে পরিণত করতে চায়। কিন্তু পক্ষান্তরে তারা আল্লাহর নামে চাঁদা তোলে, বিলাসী জীবনযাপন করে। তাদের এই সব অপকর্মকেও আল্লাহর আইন বলে চালিয়ে দেয় এবং তারা সমালোচনা ও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকে। আমাদের দেশে রাজনীতিকদের, বিশেষ করে জামায়াত-বিএনপির ইতিহাস নিয়ে এত মিথ্যাচার বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ ছিল একটি ২৬ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনের শেষ পরিসমাপ্তি। এই ২৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পূর্বে মেজর জিয়ার নাম কেউ জানত না, বা তিনি আমাদের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের কোনো পর্যায়ে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে যখন বাঙালি পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য জাতির পিতার নির্দেশে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, শত শত বাঙালি সেনা কর্মকর্তার মতো জিয়াউর রহমানও তাঁদের একজন ছিলেন। তিনি সেদিন শুধু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনুরোধে, জাতির পিতার নামে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। সেই জায়গায় যদি অন্য যেকোনো বাঙালি কর্মকর্তা থাকতেন, তাকেও দিয়ে ঘোষণা দেওয়া হতো। পরবর্তী ৯ মাস মেজর জিয়া স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অধীনে থেকে ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের মধ্যে একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার মতোই বেতন-ভাতা ( ৪৫০ টাকা ) ও সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। স্বাধীনতার পরও তিনি যথাযথভাবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং উপ-প্রধান সেনাপতি হন। যুদ্ধে মেজর জিয়া ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের মধ্যে একজন ছিলেন। অর্থাৎ সামরিক বাহিনীতে তাঁর সমমর্যাদার আরও ১০ জন ছিলেন, যারা সবাই জেনারেল ওসমানীর কমান্ডে, জাতির পিতার নামে গঠিত সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালির আন্দোলনের ইতিহাস। যে আন্দোলনে শেখ মুজিব তাঁর যৌবনের ১২ বছর ৬ মাস জেলে ছিলেন এবং লক্ষ লক্ষ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জেল-জুলুম ও আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন। যে ব্যক্তি এই দীর্ঘ রাজনৈতিক বিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন, শুধু সরকারি কর্মচারী হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, সেই মেজর জিয়াকে যখন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক বলে মহা-নায়ক বানিয়ে ইতিহাস তৈরি করা হয়, তখন এই এআই যুগে পৃথিবীর মানুষের কাছে জাতি হিসেবে আমরা কতটা নিকৃষ্ট, তা-ই আমরা প্রমাণ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ গেরিলা যোদ্ধা কোনো বেতন-ভাতা বা লজিস্টিক সুবিধা ছাড়াই জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। যারা জীবন দিয়েছেন, যারা সম্ভ্রম হারিয়েছেন, তাঁদের কী উপাধি ও ক্ষতিপূরণ দিয়ে সম্মানিত করব? আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে যেন তা ছিল একজন মেজরের হঠাৎ যুদ্ধ ঘোষণা। আর অন্যদিকে মৌলবাদী শক্তি, যারা ছিল ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি, তারা ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ইতিহাস মুছে ফেলে নতুন করে ২০২৪ সালকে আসল মুক্তির যুদ্ধ বলে চালিয়ে দিতে চায়। ২০২৪ সালে এই মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত চিহ্ন ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা—এই শব্দগুলোর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আর এ জন্য তারা নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে মেজর জিয়াকে, যার নাম মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে নেই; তাঁকে শুধু ৯ মাসের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হিসেবে ব্যবহার করে প্রকৃত স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাস মুছে ফেলতে, স্বাধীনতার নায়কদের নাম মুছে ফেলতে এবং একটি পৌরাণিক মৌলবাদী রাষ্ট্র তৈরি করে মানুষের মুক্তচিন্তা ও গণতন্ত্রের আন্দোলন চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করতে চায়। তাই আজ আওয়ামী লীগের রাজনীতি বন্ধ। আমাদের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে চারবার নিষিদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার চিরস্থায়ীভাবে বিলুপ্ত করার জন্যই আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, এই উপমহাদেশে একমাত্র আওয়ামী লীগই আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করেছিল। আর এ জন্যই দেশ গত ১৬ বছরে একটি উন্নয়নশীল ও সমৃদ্ধ দেশের পর্যায়ে পরিণত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ জাতীয় মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও দেশের স্বার্থ কারও কাছে বিক্রি করেনি। আজ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে দেশকে আমেরিকার কাছে গোলামির চুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম অনিরাপদ দেশে পরিণত হয়েছে। ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা নারীজাতিকে গনিমতের মাল হিসেবে প্রচার করছে। মাদ্রাসাগুলো আজ শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তথাকথিত জামায়াত, এমপি ও মৌলবাদী সংগঠনের নেতারা এখন প্রকাশ্যেই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ করছে। তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে এসবের পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছে। গত দুই বছরে বাংলাদেশ একটি মধ্যযুগীয় বর্বর দেশে পরিণত হয়েছে। এখন নারীদের পণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানুষের কোনো আইনি নিরাপত্তা নেই। আইন, আদালত ও সরকার শুধু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের এবং বিজয়ীদের বিচারের নামে নির্যাতন করছে। মুজিবের আদর্শ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষের মানুষদের সবকিছুই নিশ্চিহ্ন করে সর্বক্ষেত্রে একটি মৌলবাদী, অকার্যকর রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আজ বাংলাদেশ আলোর পথ থেকে অন্ধকারের পথে হাঁটছে। আর এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যেতে পারবে একমাত্র জাতির পিতার আদর্শ। আজ জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ, ক্ষমতা দখলকারী মৌলবাদীদের আতঙ্ক শুধু শেখ মুজিব। তাঁর নাম নিলেই ক্ষমতার মসনদ মহা টাইফুনের মতো কেঁপে ওঠে। আর তাই আগামীতে মুজিবের রক্ত ও আদর্শের অতন্দ্র প্রহরী শেখ হাসিনার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি মুক্তিযোদ্ধার রক্তের উত্তরাধিকারীরা আরেকটি যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করবে এবং মনুষ্যত্ব, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। এর মাধ্যমেই হবে জাতির পিতার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা। আর ২০২৬-এর ১৫ আগস্ট এটাই হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা পক্ষের শক্তির শপথ। জয় বাংলা।

লেখক : শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক